বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ বাইনান্স ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাইবার হামলার শিকার হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব প্রাথমিক হিসাবে, হ্যাকারেরা প্রায় ৬৩০ কোটি মার্কিন ডলারের (প্রায় ৮০ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা) ক্রিপ্টো সম্পদ চুরি করেছে। ব্লকচেইন বিশ্লেষক সংস্থা চেইনালাইসিস বলছে, ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৬৪০ কোটি ডলার (প্রায় ৮১ হাজার ৯২০ কোটি টাকা)। পরিমাণের দিক থেকে এটি এখন পর্যন্ত রেকর্ড করা সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টো চুরি, যা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুবাইভিত্তিক এক্সচেঞ্জ বাইবিট থেকে চুরি হওয়া ১৫০ কোটি ডলারের (প্রায় ১৯ হাজার ২০০ কোটি টাকা) প্রায় চার গুণ।
এক লেনদেনেই খালি বিশাল ওয়ালেট
ঘটনার সূত্রপাত বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর আন্তর্জাতিক সময় (ইউটিসি) রাত ৮টা ২৪ মিনিটে, বাংলাদেশ সময় শুক্রবার ভোর ২টা ২৪ মিনিটে। এ সময় একটি মাত্র লেনদেনে বাইনান্সের দীর্ঘদিনের পরিচিত হট ওয়ালেট "বাইনান্স ১৪" থেকে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৪৬৪টি ইথার, প্রায় ১৬২ কোটি ইউএসডিটি (প্রায় ২০ হাজার ৭৩৬ কোটি টাকা) এবং আরও ৬০টির বেশি টোকেন একটি নতুন ওয়ালেটে চলে যায়। দুই মিনিট পর "বাইনান্স ১৬" নামের আরেকটি ওয়ালেট থেকে ২৮ হাজারের বেশি ইথার একই ঠিকানায় যায়। এর কিছুক্ষণ পর আরেকটি হট ওয়ালেট থেকে ৭৮ কোটি ইউএসডিসি (প্রায় ৯ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা) সরানো হয়।
প্রথমে ঘটনাটিকে একটি সন্দেহজনক লেনদেন মনে হলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে স্পষ্ট হয়, এটি নজিরবিহীন এক হ্যাক। ইথেরিয়াম, বিটকয়েন, ট্রন, সোলানা, এক্সআরপি লেজার, আরবিট্রাম, অ্যাভালাঞ্চ, অপটিমিজম, বেস ও পলিগন, মোট ১০টি ব্লকচেইন থেকে অর্থ সরানো হয়েছে। এর বড় অংশই সরানো হয় মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে।
ব্লকচেইন বিশ্লেষকেরা জানান, যে ঠিকানা থেকে হামলা চালানো হয়, সেটিতে আগের দিন ২৮ অক্টোবর অর্থের উৎস গোপন রাখার সেবা টর্নেডো ক্যাশ থেকে সামান্য পরিমাণ ইথার পাঠানো হয়েছিল। এটি পরিকল্পিত হামলার ইঙ্গিত দেয়।
হামলার কৌশল
বিশ্লেষকদের মতে, হামলাকারী ইথেরিয়ামের তুলনামূলক নতুন একটি ফিচার ইআইপি-৭৭০২ ব্যবহার করেছে, যার মাধ্যমে একটি ওয়ালেটের নিয়ন্ত্রণ নির্দিষ্ট সফটওয়্যারের হাতে দেওয়া যায়। বাইনান্সের ওয়ালেট দিয়ে এই অনুমতিতে সই করিয়ে নিয়ে হামলাকারী ওয়ালেটটিকে এমনভাবে বদলে দেয়, যাতে এতে আসা সব অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার নিজের ঠিকানায় চলে যায়।
বাইনান্সের প্রাথমিক তদন্তে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির এক ডেভঅপস প্রকৌশলীর ল্যাপটপ হ্যাক হওয়ার মাধ্যমে হামলাকারী একটি অভ্যন্তরীণ সার্ভিসে ঢুকে পড়ে এবং সেখান থেকে অননুমোদিত উত্তোলনের লেনদেন জমা দেয়। তবে ওয়ালেটের প্রাইভেট কি ফাঁস হওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। আক্রান্ত ঠিকানার অনুমোদন বাতিল করা হয়েছে।
সন্দেহের তীর উত্তর কোরিয়ার দিকে
ব্লকচেইন বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবস ও চেইনালাইসিস এই হামলার জন্য উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্র-সমর্থিত হ্যাকার গোষ্ঠী ট্রেডারট্রেইটরকে দায়ী করছে। টিআরএমের এক জ্যেষ্ঠ তদন্তকারী মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেছেন, এর পেছনে যে উত্তর কোরিয়া, তা নিয়ে তাঁর কোনো সন্দেহ নেই। এই গোষ্ঠীটি বাইবিট হ্যাকসহ আরও কয়েকটি বড় ক্রিপ্টো চুরির সঙ্গে যুক্ত বলে ধারণা করা হয়।
তবে হামলাকারী কে, সে বিষয়ে বাইনান্স এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেয়নি। উত্তর কোরিয়া অতীতে ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ হ্যাকের সব অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।
রাতভর ঘটনাপ্রবাহ
হ্যাক শুরুর ঘণ্টাখানেক পর বাংলাদেশ সময় ভোর ৩টা ১৫ মিনিটের দিকে বাইনান্সের প্রতিষ্ঠাতা চাংপেং ঝাও (সিজেড) এক্স-এ লেখেন, ঘটনাটি দেখে হ্যাক বলেই মনে হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানের শেয়ারহোল্ডার হিসেবে তিনি আশা করেন, গ্রাহকদের সব অর্থ পুরোপুরি সুরক্ষিত থাকবে।
ভোর সোয়া ৪টার দিকে বাইনান্স একাধিক নেটওয়ার্কে অর্থ উত্তোলন বন্ধ করে দেয়। প্রাথমিক পর্যায়ের টোকেন লেনদেনের প্ল্যাটফর্ম বাইনান্স আলফায়ও লেনদেন স্থগিত করা হয়। সকাল ৬টার দিকে বাইনান্সের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও কো-সিইও ই হে আনুষ্ঠানিকভাবে নিরাপত্তা ঘটনার কথা স্বীকার করেন।
জব্দ ৩৮ হাজার কোটি টাকার সম্পদ
চুরি হওয়া অর্থের একটি বড় অংশ আটকে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। বাইনান্স জানিয়েছে, ব্লকচেইন অংশীদারদের সহায়তায় প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের (প্রায় ৩৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকা) সম্পদ জব্দ করা গেছে। এর মধ্যে স্টেবলকয়েন ইউএসডিটি ও ইউএসডিসি মিলিয়ে প্রায় ২৩০ কোটি ডলার (প্রায় ২৯ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা)। স্টেবলকয়েন দুটির ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান টেথার ও সার্কেল হামলাকারীর ওয়ালেটে থাকা এই অর্থ ফ্রিজ করে দেয়। টেথারের প্রধান নির্বাহী পাওলো আরদোইনো জানান, তাঁরা ১৫৬ কোটির বেশি ইউএসডিটি (প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা) জব্দ করেছেন।
এ ছাড়া হামলাকারী যাতে চুরি করা সম্পদ জামানত রেখে ঋণ নিতে না পারে, সে জন্য বিকেন্দ্রীভূত ঋণ প্ল্যাটফর্ম আভে তাদের সংশ্লিষ্ট বাজার সাময়িকভাবে বন্ধ রাখে।
গ্রাহকের ক্ষতি পূরণের ঘোষণা
ই হে এক্স-এ দেওয়া পোস্টে জানিয়েছেন, গ্রাহকদের অর্থ নিরাপদ এবং হ্যাকের কারণে হওয়া সব ক্ষতি বাইনান্স বহন করবে। গ্রাহক সুরক্ষার জন্য গঠিত তহবিল সিকিউর অ্যাসেট ফান্ড ফর ইউজার্স (সেফু) এবং কোম্পানির নিজস্ব তহবিল থেকে এই ক্ষতি পূরণ করা হবে।
শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে দেওয়া এক হালনাগাদ বার্তায় ই হে জানান, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অর্থ উত্তোলন সেবা আবার চালু হওয়ার আশা করছেন তাঁরা। উত্তোলন সেবা ও ঠিকানা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার কাজ চলছে। তিনি আরও জানান, ডিপোজিট স্বাভাবিকভাবেই চলছে। তবে এর আগে বাইনান্স ডিপোজিট ও উত্তোলন দুটিই বন্ধ রাখার কথা জানিয়েছিল, ফলে এ বিষয়ে কিছুটা অস্পষ্টতা রয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান বাইনান্স ডট ইউএস এই হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।
রিজার্ভ নিয়ে প্রশ্ন
ঘটনাটি বাইনান্সের রিজার্ভ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টো সংবাদমাধ্যম কয়েনডেস্কের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যে ওয়ালেটগুলো খালি করা হয়েছে, সেগুলো বাইনান্সের ১ অক্টোবরের "প্রুফ অব রিজার্ভ" তালিকায় ছিল। অর্থাৎ চুরি হওয়া সম্পদ গ্রাহকদের ব্যালান্সের বিপরীতে রাখা রিজার্ভেরই অংশ। হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ২ লাখ ৪ হাজার ৫০০ ইথার চুরি হওয়ায় বাইনান্সের ইথার রিজার্ভ গ্রাহকদের পাওনার প্রায় ৯৪ শতাংশে নেমে আসতে পারে। ক্ষতি পূরণের পর রিজার্ভের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাইনান্স।
বাজারে বড় ধস
হ্যাকের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ক্রিপ্টো বাজারে বড় দরপতন হয়। বিটকয়েনের দাম নেমে আসে ৭৭ হাজার ডলারে (প্রায় ৯৮ লাখ ৫৬ হাজার টাকা)। বাইনান্সের নিজস্ব টোকেন বিএনবির দাম মাত্র ৩৫ মিনিটে ৬.৩ শতাংশ কমে যায়, যা শীর্ষ ১০টি ক্রিপ্টোকারেন্সির মধ্যে সবচেয়ে বড় পতন। মাত্র এক ঘণ্টায় বাজারে প্রায় ৬২ কোটি ৮০ লাখ ডলারের (প্রায় ৮ হাজার ৩৮ কোটি টাকা) পজিশন লিকুইডেট হয়ে যায়।
কেন্দ্রীভূত এক্সচেঞ্জের ঝুঁকি আবার আলোচনায়
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘটনা কেন্দ্রীভূত ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জে অর্থ রাখার ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। হট ওয়ালেট হলো ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত ওয়ালেট, যা দ্রুত গ্রাহকদের উত্তোলনের অর্থ পরিশোধে ব্যবহৃত হয়। এগুলো সুবিধাজনক হলেও সাইবার হামলার ঝুঁকি বেশি।
বাইনান্স জানিয়েছে, তদন্ত এখনো চলছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে হামলার বিস্তারিত কারিগরি প্রতিবেদন প্রকাশ করবে প্রতিষ্ঠানটি।









