মধ্য আমেরিকার দেশ পানামার দক্ষিণ উপকূলে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এতে বাড়িঘর, গির্জা ও বিভিন্ন ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির ছয়টি প্রদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ফ্লাইট চলাচল। ভূমিকম্পের পর একাধিক আফটারশক অনুভূত হওয়ায় আতঙ্কিত বাসিন্দারা ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় ও খোলা জায়গায় আশ্রয় নেন। সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কর্তৃপক্ষ।

শুক্রবার বিকেলে পানামার দক্ষিণাঞ্চলে এই ভূমিকম্প আঘাত হানে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের প্রায় ৭ দশমিক ৮ মাইল গভীরে।

ভূমিকম্পের পর বিভিন্ন এলাকায় ভবনে ফাটল ও স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়। একের পর এক মৃদু কম্পন অনুভূত হওয়ায় অনেক বাসিন্দাকে আতঙ্কিত অবস্থায় রাস্তায় জড়ো হতে দেখা যায়। কোথাও কোথাও বয়স্ক বাসিন্দাদের কান্নায় ভেঙে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে।

citytouch 728-X-90

দক্ষিণ পানামার হেরেরা প্রদেশের ৭৪ বছর বয়সী বাসিন্দা রিকার্ডো ব্রাউন জানান, তাঁদের বাড়িতে ফাটল ধরেছে। বাড়িটি ধসে পড়ার আশঙ্কায় তাঁরা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, লাস মিনাস এলাকায় বেশ কয়েকটি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বিদ্যুৎ সরবরাহ ও বিমান চলাচল ব্যাহত

ভূমিকম্পের প্রভাবে পানামার ছয়টি প্রদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নাতুরগি। একই সঙ্গে আঞ্চলিক বিমান যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র টোকুমেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়।

রাজধানী পানামা সিটিতে ভূমিকম্পের পর যান চলাচলে তীব্র জট সৃষ্টি হয়। ভবনগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেওয়ায় বিভিন্ন অফিস থেকে কর্মীদের আগেভাগে ছুটি দেওয়া হয়। শহরের মেট্রোরেল চলাচলও বন্ধ রাখা হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আগেভাগে ছুটি ঘোষণা করায় ইউনিফর্ম পরা শিক্ষার্থীদের রাস্তায় নেমে আসতে দেখা যায়। দেশজুড়ে শ্রেণি কার্যক্রমও স্থগিত করা হয়।

ভূমিকম্পের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ থেকে ১০ শতাংশের সমপরিমাণ হতে পারে।

রাজধানী পানামা সিটিতে বিভিন্ন ভবন থেকে লোকজনকে সরিয়ে নেওয়া হয়। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই শহরে কম্পন থামার পরও অনেক মানুষকে রাস্তায় ও পার্কে অবস্থান করতে দেখা যায়।

প্রায় ৪০ সেকেন্ড ধরে অনুভূত হয় কম্পন

পানামার ভূবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক নেস্টর লুক জানান, আজুয়েরো-সোনা ফল্ট সিস্টেমের কারণে এই ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর মতে, সক্রিয় এই চ্যুতি ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে চাপ জমা হচ্ছিল। একপর্যায়ে সেই চাপ থেকে বিপুল শক্তি নির্গত হওয়ায় ভূমিকম্পটি ঘটে।

তিনি জানান, কম্পন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনুভূত হয়েছে। রাজধানী পানামা সিটিতে তিনি নিজেও প্রায় ৪০ সেকেন্ড ধরে কম্পন অনুভব করেন। দেশের অন্য কিছু এলাকায় কম্পনের স্থায়িত্ব আরও বেশি হয়ে থাকতে পারে।

রাজধানীর একটি পুরোনো ভবনের ষষ্ঠ তলায় থাকা সাবিনা রিওস জানান, ভূমিকম্পটি ছিল অস্বাভাবিক শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী। কয়েক বছরের মধ্যে এত দীর্ঘ সময় ধরে কম্পন অনুভব করেননি বলেও জানান তিনি।

গির্জা ও বিভিন্ন ভবনে ক্ষয়ক্ষতি

ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের কাছে হেরেরা প্রদেশের কম জনবসতিপূর্ণ লা পিতালোজা এলাকার কাছাকাছি।

প্রতিবেশী দেশ কোস্টারিকার রাজধানী সান হোসেতেও কম্পন অনুভূত হয়েছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে, পানামা সিটি ও ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের মাঝামাঝি অবস্থিত পেনোনোমে শহরে বিভিন্ন স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে একটি গির্জা ও আশপাশের কয়েকটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দৃশ্য দেখা যায়। কিছু স্থাপনার অংশ ধসে পড়ার ঘটনাও উঠে এসেছে এসব ভিডিওতে।

পানামার বেসামরিক সুরক্ষা সংস্থার প্রধান ওমর স্মিথ জানান, হেরেরা প্রদেশের রাজধানী চিত্রে এবং উপকূলীয় লস সান্তোস প্রদেশেও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র নির্ধারণে আরও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

সুনামির আশঙ্কা নেই, সতর্ক অবস্থানে প্রশাসন

শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে সুনামির আশঙ্কা তৈরি হলেও পরে যুক্তরাষ্ট্রের সুনামি সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জানায়, সুনামির আর কোনো আশঙ্কা নেই।

এদিকে, ভূমিকম্প মোকাবিলায় জরুরি প্রস্তুতি যাচাই করতে আগামী সোমবার পানামায় দেশব্যাপী সরিয়ে নেওয়ার মহড়া অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে উদ্ধার কার্যক্রম ও মানুষের নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করার সক্ষমতা যাচাই করাই এই মহড়ার উদ্দেশ্য।

পানামার প্রেসিডেন্ট হোসে রাউল মুলিনো জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের সব বিভাগকে সক্রিয় করা হয়েছে। একই সঙ্গে জনগণকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

শক্তিশালী এই ভূমিকম্পের পর দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে উদ্ধার ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোর নিরাপত্তা যাচাই, বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করা এবং পরিবহনব্যবস্থা পুনরায় চালু করাই এখন কর্তৃপক্ষের প্রধান অগ্রাধিকার।