বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত জাদুঘর ল্যুভরে আলোচিত চুরির ঘটনার এক বছর পরও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এবার সেই প্রশ্ন তুলেছেন একসময় শিল্পকর্ম চুরির সঙ্গে জড়িত থাকা ডাচ নাগরিক অক্টাভ ডারহাম। তাঁর দাবি, জাদুঘরটির নিরাপত্তাব্যবস্থায় এখনো বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে।

ডারহামের প্রশ্ন, ল্যুভরের নিরাপত্তার দায়িত্ব দিতে কর্তৃপক্ষ তাঁর কাছে আসে না কেন? ৫৩ বছর বয়সী এই ডাচ নাগরিক বর্তমানে অপরাধজগৎ থেকে সরে এসেছেন বলে দাবি করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেকে ‘ডাচ লুপিন’ হিসেবে পরিচয় দেন তিনি।

নিজের অতীত অপরাধের কথা স্বীকার করতে দ্বিধা করেন না ডারহাম। তাঁর ভাষ্য, ব্যাংক, সেফ ডিপোজিট ভল্ট ও সাঁজোয়া গাড়ি থেকে চুরি করেছেন তিনি। একসময় শিল্পকর্ম চুরিও ছিল তাঁর অপরাধের অংশ।

২০০২ সালে এক সহযোগীকে নিয়ে আমস্টারডামের ভ্যান গঘ জাদুঘর থেকে দুটি চিত্রকর্ম চুরি করেছিলেন ডারহাম। পরে গ্রেপ্তার হয়ে কারাদণ্ড ভোগ করেন তিনি। চুরি করা ছবিগুলো এক কুখ্যাত অপরাধীর কাছে বিক্রি করেছিলেন, যাঁর কাছ থেকে পরবর্তী সময়ে সেগুলো উদ্ধার করা হয়।

শিল্পকর্ম উদ্ধারে সাবেক চোরের ভূমিকা

অপরাধজগৎ থেকে সরে এলেও চুরি যাওয়া শিল্পকর্ম উদ্ধারে আগ্রহ হারাননি ডারহাম। বর্তমানে তিনি অপরাধজগতের পুরোনো যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে চুরি হওয়া মূল্যবান শিল্পকর্ম উদ্ধারে সহযোগিতা করেন। এ কাজের জন্য কোনো পারিশ্রমিক নেন না বলেও জানিয়েছেন তিনি।

ডারহাম নিজেকে পুলিশের তথ্যদাতা হিসেবে পরিচয় দিতে চান না। তাঁর মতে, তিনি মূলত বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করেন।

এ কাজে তিনি সহযোগিতা করেন ডাচ শিল্পকর্ম অনুসন্ধানী আর্থার ব্র্যান্ডের সঙ্গে। শিল্পজগতে ব্র্যান্ড ‘ইন্ডিয়ানা জোনস’ নামে পরিচিত।

২০২০ সালে নেদারল্যান্ডসের একটি জাদুঘর থেকে ভ্যান গঘের ‘স্প্রিং গার্ডেন’ চিত্রকর্মটি চুরি হয়। ২০২৩ সালে চিত্রকর্মটি একটি নীল রঙের ব্যাগে ভরে ব্র্যান্ডের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এটি উদ্ধারে ডারহামের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে জানিয়েছেন ব্র্যান্ড।

ব্র্যান্ড অতীতে আরও কয়েকটি মূল্যবান শিল্পকর্ম উদ্ধারে ভূমিকা রেখেছেন। এর মধ্যে রয়েছে পোল্যান্ড থেকে চুরি হওয়া পিটার ব্রুগেলের একটি শিল্পকর্ম এবং নাৎসি নেতা হারমান গোরিংয়ের হাতে লুট হওয়া একটি ইহুদি পরিবারের চিত্রকর্ম।

ইউরোপজুড়ে জাদুঘরে চুরির ঘটনা বাড়ছে

গত বছরের অক্টোবরে ল্যুভরে দিনের আলোয় ঢুকে নেপোলিয়ন আমলের মূল্যবান অলংকার নিয়ে পালিয়ে যায় একদল চোর। ওই ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফ্রান্সের আরেকটি জাদুঘরে চুরির ঘটনা ঘটে। সেখান থেকে বিপুল মূল্যের স্বর্ণ ও রুপার মুদ্রা নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।

এরপর ইউরোপের বিভিন্ন জাদুঘর, আর্ট গ্যালারি ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে চুরির ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।

গত মাসে ফ্রান্সের রেনোয়া জাদুঘর থেকে দুটি চিত্রকর্ম চুরি হওয়ার পর সেগুলো উদ্ধার করা হয়। এর আগে মার্চে ইতালির পারমার কাছে ম্যাগনানি রোকা ফাউন্ডেশন থেকে রেনোয়া, সেজান ও মাতিসের তিনটি চিত্রকর্ম চুরি হয়েছিল। সেগুলোও পরে উদ্ধার করা হয়।

গত আগস্টে সিসিলির একটি জাদুঘর থেকে রেনেসাঁ যুগের চারটি চিত্রকর্ম চুরি হয়। একই মাসে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনার মিউজিয়াম অব অ্যাপ্লায়েড আর্টস থেকে প্রায় ৪০ লাখ ডলার মূল্যের একটি হীরার নেকলেস চুরি হওয়ার খবর পাওয়া যায়।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ইউরোপোলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাদুঘর থেকে শিল্পকর্ম চুরির ঘটনায় অপরাধীরা ক্রমেই বেশি বেপরোয়া ও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে।

শিল্পকর্ম অনুসন্ধানী আর্থার ব্র্যান্ডের মতে, ল্যুভরের চুরির ঘটনা অপরাধীদের উৎসাহিত করেছে। তাঁদের ধারণা, বিশ্বের অন্যতম সুরক্ষিত জাদুঘর থেকে শিল্পকর্ম চুরি করা সম্ভব হলে ছোট জাদুঘরগুলোতে চুরি করা আরও সহজ হতে পারে।

কেন ঝুঁকিতে ইউরোপের জাদুঘরগুলো

বিশ্বের মূল্যবান শিল্পকর্মের বড় একটি অংশ ইউরোপের জাদুঘরগুলোতে সংরক্ষিত রয়েছে। একই সঙ্গে অনেক জাদুঘর শত শত বছরের পুরোনো ভবনে পরিচালিত হওয়ায় আধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থা স্থাপন করা কঠিন হয়ে পড়ে।

জাদুঘর নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক প্রতিষ্ঠানে দর্শনার্থীদের প্রবেশ সহজ রাখতে হয়। ফলে ব্যাংক বা গয়নার দোকানের মতো কঠোরভাবে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। অনেক ক্ষেত্রে কাচের প্রদর্শনী বাক্স ও নিরাপত্তারক্ষীরাই দর্শনার্থীদের কাছ থেকে মূল্যবান শিল্পকর্মকে আলাদা রাখেন।

বেলজিয়ামভিত্তিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ইব্রাহিম বালুতের মতে, অপরাধীরা এখন হাতুড়ি, কুঠার, শাবল এবং ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে দ্রুত চুরি সম্পন্ন করছে। ফলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই মূল্যবান বস্তু নিয়ে পালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে।

তিনি বলেন, শুধু নিরাপত্তা ক্যামেরা স্থাপন করলেই চুরি ঠেকানো যায় না। এর জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষিত কর্মী, শক্তিশালী প্রদর্শনী বাক্স, কার্যকর অ্যালার্ম, নিয়মিত ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা।

চুরি করা শিল্পকর্ম বিক্রি করাই বড় সমস্যা

শিল্পকর্ম অনুসন্ধানী আর্থার ব্র্যান্ডের মতে, চোরেরা এখন স্বর্ণ, রুপা ও হীরার মতো মূল্যবান বস্তু চুরির দিকে বেশি ঝুঁকছে। কারণ, এসব বস্তু গলিয়ে বা নতুনভাবে কেটে ফেললে সেগুলোর পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে।

তবে বিখ্যাত চিত্রকর্ম চুরি করলেই তা সহজে বিক্রি করা যায় না। চুরি হওয়ার পর মূল্যবান শিল্পকর্ম আন্তর্জাতিক অপরাধসংক্রান্ত তথ্যভান্ডারে চিহ্নিত হয়ে গেলে সেগুলো প্রকাশ্যে বিক্রি করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

ব্র্যান্ডের ভাষ্য, চুরি করা শিল্পকর্ম কখনো কখনো অপরাধীদের দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। গ্রেপ্তার হওয়ার পর শাস্তি কমানোর চেষ্টা বা অন্য সুবিধা আদায়ের জন্য অপরাধীরা সেগুলো ফেরত দেওয়ার প্রস্তাব দিতে পারে।

শিল্পকর্ম অপরাধবিষয়ক গবেষণা সংস্থা অ্যাসোসিয়েশন ফর রিসার্চ ইনটু ক্রাইমস এগেইনস্ট আর্টের প্রধান লিন্ডা অ্যালবার্টসনের মতে, মূল্যবান ও সহজে বহনযোগ্য শিল্পকর্ম, দুর্বল নিরাপত্তা এবং সীমিত জনবল একসঙ্গে চোরদের জন্য সুযোগ তৈরি করে।

তিনি মনে করেন, অনেক জাদুঘর নিরাপত্তা উন্নত করার উদ্যোগ নিলেও এখনো বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে গুরুতর ঘাটতি রয়েছে। নিরাপত্তা বাড়াতে প্রয়োজন পর্যাপ্ত অর্থায়ন, প্রশিক্ষিত কর্মী এবং নিয়মিত মহড়া।

ল্যুভরের নিরাপত্তা নিয়ে এখনো প্রশ্ন ডারহামের

ডারহামের দাবি, সম্প্রতি ল্যুভর পরিদর্শন করে তিনি কয়েকটি জানালায় ফাটল দেখতে পেয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, গত বছরের চুরির ঘটনায় ব্যবহৃত প্রবেশপথে লোহার বেড়া ও ক্যামেরা স্থাপন করা হলেও পাশের কিছু জানালার নিরাপত্তা আগের মতোই দুর্বল রয়েছে।

এ বিষয়ে জাদুঘর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ডারহামের দাবি, কর্তৃপক্ষ তাঁকে নিরাপত্তা পরামর্শ দেওয়ার সুযোগ দিলে তিনি এখনো জাদুঘরটির নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা দেখিয়ে দিতে পারবেন। একসময় যিনি শিল্পকর্ম চুরির অপরাধে জড়িত ছিলেন, তাঁর কাছ থেকেই এখন নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান আসছে—যা ল্যুভরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।