বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা। টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় তাঁকে ও তাঁর সঙ্গে থাকা বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে কারা ধাওয়া করেছিল—মাদক কারবারি, নাকি পুলিশের সদস্য? এ রহস্যের সমাধানে কাজ করছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) জানিয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেছেন, টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় অবস্থানের সময় পোশাক পরা দুই পুলিশ সদস্যকে দেখে তাঁরা দুজন দুই দিকে দৌড়ে পালান। একপর্যায়ে তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপ দেন এবং দীপ পালিয়ে যান। তবে দীপের এই বক্তব্যের সত্যতা এখনো যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
পিবিআইয়ের অতিরিক্ত ডিআইজি এনায়েত হোসেন মান্নান জানান, দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তুরাগ নদসংলগ্ন মাজার বস্তি এলাকা থেকে নম্বরপ্লেটবিহীন একটি সুজুকি জিক্সার এসএফ মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। এটি তাহসিফের মোটরসাইকেল বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) মাধ্যমে যাচাইয়ের পর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার আগে ভবনের নিচে দীপের সঙ্গে তাঁর দেখা হওয়ার একটি সিসিটিভি ফুটেজ পেয়েছে পিবিআই। ফুটেজে দুজনকে হাত মেলানোর পর আলাদা মোটরসাইকেলে করে চলে যেতে দেখা যায়। এর সূত্র ধরে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়।
পরে দীপকে সঙ্গে নিয়ে পিবিআইয়ের একটি দল টঙ্গীর মাজার বস্তি ও রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা পরিদর্শন করে। তদন্তকারীরা জানান, দীপের বক্তব্য অনুযায়ী, পুলিশের পোশাক পরা দুই ব্যক্তিকে দেখে তাঁরা পালানোর চেষ্টা করেছিলেন। তবে ওই ব্যক্তিরা প্রকৃতপক্ষে পুলিশের সদস্য ছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তকারীদের ধারণা, মাদক কারবারিদের তৎপরতা অথবা পুলিশের ধাওয়ার মধ্যে পড়ে তাহসিফ নদে ঝাঁপ দিয়ে থাকতে পারেন। তবে তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। দীপের বক্তব্যে কিছু অসংগতিও পাওয়া গেছে, সেগুলো যাচাই করছেন তদন্তকারীরা।
তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার আগে রাজধানীর উত্তরার একটি রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় কাটিয়েছিলেন বলেও তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন এক তরুণী ও দীপ। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ওই তরুণীকে তাহসিফের বান্ধবী হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, রাতে তাহসিফ ও ওই তরুণী একটি মোটরসাইকেলে করে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের একটি রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে যান। কিছুক্ষণ পর আরেকটি মোটরসাইকেলে সেখানে পৌঁছান দীপ। পরে তিনজন একসঙ্গে রেস্টুরেন্টের ভেতরে প্রবেশ করেন।
অন্য একটি ফুটেজে দেখা যায়, তাহসিফ ও তাঁর বান্ধবী লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে দীপের জন্য অপেক্ষা করছেন। হেলমেট পরা অবস্থায় দীপ সেখানে পৌঁছালে তিনজন একসঙ্গে লিফটে ওঠেন। প্রায় দেড় ঘণ্টা অবস্থানের পর তাঁরা মোটরসাইকেলে করে সেখান থেকে বেরিয়ে যান।
তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরে তাহসিফের বান্ধবীকে তাঁর বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়। এরপর তাহসিফ ও দীপ টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যান।
এর আগে উত্তরার বাসা থেকে বের হওয়ার পর রাতে মুঠোফোনে মাকে বাসায় ফেরার কথা জানিয়েছিলেন তাহসিফ। কিন্তু এরপর আর বাসায় ফেরেননি তিনি। পরে উত্তরখানের রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে নৌ-পুলিশ। সঙ্গে থাকা আইফোনের মাধ্যমে তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
এদিকে তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম বলেছেন, তাঁর ছেলের মৃত্যু আত্মহত্যা নয়। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় ওই রাতের গতিবিধি, যাতায়াত এবং বিভিন্ন স্থানে তাঁর অবস্থানের তথ্য সংগ্রহ করছেন তদন্তকারীরা। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং তাঁকে ধাওয়া করা ব্যক্তিদের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।









