অপরাধজগতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ কাটিয়ে প্রচলিত ব্যাংকিং ও বিনিয়োগের বিকল্প হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে ক্রিপ্টোকারেন্সি খাত। তবে সাম্প্রতিক এক বড় ধরনের হ্যাকিংয়ের ঘটনা এ খাতের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিময় প্রতিষ্ঠান বাইন্যান্স থেকে মাত্র ২০ মিনিটে ৬০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের ক্রিপ্টো সম্পদ সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

ঘটনাটি ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতের নিরাপত্তাঝুঁকি এবং বিনিয়োগকারীদের সম্পদ সুরক্ষার বিষয়টি সামনে এনেছে। চুরি হওয়া অর্থের প্রায় অর্ধেক ছিল স্টেবলকয়েন। এসব মুদ্রার ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান দ্রুত সেগুলো জব্দ করতে সক্ষম হয়েছে। তবে বাকি অর্থ ছিল বিটকয়েন ও ইথারের মতো ডিজিটাল মুদ্রায়, যেগুলোর কোনো কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ নেই। ফলে এসব সম্পদ উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছেন ক্রিপ্টো গবেষকরা।

গবেষকদের হিসাবে, বাইন্যান্সের ক্ষতির পরিমাণ ৩০০ কোটি ডলারের বেশি হতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবহারকারীদের মোট ১৫ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের সম্পদের তুলনায় এ ক্ষতি কম হলেও বাইন্যান্সের রাখা ১০০ কোটি ডলারের জরুরি তহবিলের তুলনায় তা অনেক বেশি।

তবে বাইন্যান্স জানিয়েছে, জরুরি তহবিলসহ প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য সম্পদ ব্যবহার করে গ্রাহকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ব্যবহারকারীদের অর্থ নিরাপদ।

হ্যাকিংয়ের ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাইন্যান্সে আমানত ও অর্থ উত্তোলন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর আগে ক্রিপ্টোভিত্তিক পূর্বাভাস বাজার পলিমার্কেটেও তুলনামূলক ছোট একটি নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে। জুনের পর এটি প্রতিষ্ঠানটিতে দ্বিতীয় হ্যাকিংয়ের ঘটনা। তবে দুটি ঘটনার মধ্যে কোনো সম্পর্ক থাকার আশঙ্কা কম।

বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান বাবলম্যাপসের তথ্য অনুযায়ী, পলিমার্কেটের প্রায় ৭০০ ব্যবহারকারীর হিসাব থেকে অনুমতি ছাড়া ২৭ লাখ ডলার তুলে নেওয়া হয়েছে। বাইন্যান্সের মতো পলিমার্কেটও গ্রাহকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

তবে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রাহকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়াই দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যথেষ্ট উপায় নয়।

কেন ঝুঁকিপূর্ণ ক্রিপ্টোকারেন্সি

ক্রিপ্টো অবকাঠামো প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল সেটেলমেন্ট নেটওয়ার্কের প্রধান নির্বাহী রায়ান কার্কলি বলেন, বাইন্যান্সের আর্থিক সক্ষমতা ক্ষতি সামাল দেওয়ার মতো হওয়া ইতিবাচক। তবে আর্থিক সক্ষমতা ও পরিচালনাগত নিরাপত্তাকে এক করে দেখার সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টো বিনিময় প্রতিষ্ঠানকেও জরুরি ভিত্তিতে সম্পদ জব্দ করা ও ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। যেসব প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে বিপুল অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করছে ক্রিপ্টো খাত, তাদের আস্থা অর্জনের ক্ষেত্রে এটি বড় বাধা।

বাইন্যান্স হ্যাক হওয়ার খবর প্রকাশের পর বিটকয়েন ও ইথারের দামও কমে যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেকোনো প্রতিষ্ঠানই সাইবার হামলার শিকার হতে পারে। তবে বাইন্যান্সের মতো কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত ক্রিপ্টো বিনিময় প্রতিষ্ঠানগুলো হ্যাকারদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয় লক্ষ্য। এর অন্যতম কারণ, ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মতো কঠোর নিয়ন্ত্রক বিধির আওতায় সব সময় এসব প্রতিষ্ঠানকে কাজ করতে হয় না।

এ ছাড়া দ্রুত ও তুলনামূলক গোপনীয়ভাবে সীমান্ত পেরিয়ে অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ থাকায় দীর্ঘদিন ধরেই অপরাধী চক্রগুলোর কাছে ক্রিপ্টোকারেন্সি জনপ্রিয়।

চীনে প্রতিষ্ঠিত হলেও বাইন্যান্সের কোনো নির্দিষ্ট সদর দপ্তর নেই। অর্থপাচারবিরোধী মার্কিন ফেডারেল আইন লঙ্ঘনসহ বিভিন্ন অভিযোগে ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠানটি দোষ স্বীকার করে। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির কানাডীয় প্রতিষ্ঠাতা চ্যাংপেং ঝাওকে চার মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁকে ক্ষমা করেন। তবে আইন অনুযায়ী তিনি এখনো বাইন্যান্স পরিচালনা করতে পারেন না।

এদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ব্যবহার ইন্টারনেটজুড়ে নিরাপত্তাঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে।

ব্লকচেইন বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান চেইনঅ্যানালাইসিসের গবেষকরা জানিয়েছেন, বাইন্যান্সে হ্যাকিংয়ের ঘটনায় অর্থপাচারের এমন কিছু ধরন শনাক্ত করা হয়েছে, যা আগে দেখা যায়নি। অল্প সময়ে হাজার হাজার লেনদেনের মাধ্যমে হামলাকারীরা অর্থের গতিপথ আড়াল করতে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ব্যবহার করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কীভাবে নিজের ক্রিপ্টো সম্পদ সুরক্ষিত রাখবেন

মার্কিন প্রশাসন ক্রিপ্টো খাতের প্রতি ইতিবাচক অবস্থান নিলেও এ খাতে বিনিয়োগের ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ক্রিপ্টো বিনিয়োগকারীদের বড় অংশ কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত বিনিময় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে লেনদেন করেন। কিন্তু প্রচলিত ব্যাংকের মতো এসব প্রতিষ্ঠানে গ্রাহকের আমানতের জন্য ফেডারেল বীমা সুরক্ষা নেই।

ক্রিপ্টো গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিস্টোন রিসার্চ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ইমান শাফেই বলেন, কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত বিনিময় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান ঝুঁকি হলো, পুরো ব্যবস্থা একটি কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল। সেই ব্যবস্থায় হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটলে একসঙ্গে অনেক গ্রাহকের অর্থ ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

তাঁর পরামর্শ, ক্রিপ্টো কেনাবেচার জন্য যে বিনিময় প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করা হয়, সেখানে দীর্ঘ সময় অর্থ জমা রাখা উচিত নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণের জন্য নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে থাকা ডিজিটাল ওয়ালেটে ক্রিপ্টো সম্পদ সরিয়ে নেওয়া ভালো।

তবে নিজস্ব ডিজিটাল ওয়ালেট ব্যবহারেরও ঝুঁকি রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ব্যবহারকারী নিজেই নিজের সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকেন। কেউ পাসওয়ার্ড বা প্রয়োজনীয় প্রবেশসংক্রান্ত তথ্য হারিয়ে ফেললে তা উদ্ধারের জন্য কোনো গ্রাহকসেবা কেন্দ্রে যোগাযোগের সুযোগ থাকে না। ফলে ওই ওয়ালেটে থাকা অর্থ স্থায়ীভাবে হারিয়ে যেতে পারে।

চেইনঅ্যানালাইসিসের ২০২১ সালের এক হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত তৈরি হওয়া মোট বিটকয়েনের প্রায় ২০ শতাংশ এমন ওয়ালেটে হারিয়ে গেছে বা আটকে রয়েছে, যেগুলোতে সংশ্লিষ্ট মালিকরা আর প্রবেশ করতে পারছেন না।

সব মিলিয়ে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সাইবার হামলা, অর্থ হারানো, নিয়ন্ত্রণহীনতা এবং ডিজিটাল ওয়ালেটের নিরাপত্তা—সব বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।