আসামের বাঙালি মুসলমানদের অধিকার ও অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইকে বাংলাদেশের লড়াই বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। আসামের বিভিন্ন এলাকায় বাঙালি মুসলমানদের বাড়িঘর ও মসজিদ উচ্ছেদের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেছেন, এসব উচ্ছেদ শুধু কয়েকটি পরিবারের ওপর আঘাত নয়, বরং ওই অঞ্চলে বাঙালি মুসলমানদের ঐতিহাসিক উপস্থিতি ও রাজনৈতিক অস্তিত্ব মুছে ফেলার প্রচেষ্টা।
নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে নাহিদ ইসলাম আসামের উচ্ছেদ অভিযান, নাগরিকত্ব, ভাষাগত পরিচয় এবং এ বিষয়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভূমিকা নিয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন।
পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, প্রায় এক শতাব্দী আগে আসামের নগাঁও এলাকায় বাঙালি মুসলমান কৃষকদের বসবাস নিয়ন্ত্রণে ‘লাইন প্রথা’ চালু করা হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ওই অঞ্চলে বাঙালি মুসলমানদের বিরুদ্ধে বৈষম্য ও উচ্ছেদের প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।
নাহিদ ইসলামের দাবি, গত ১৭ ও ১৮ অক্টোবর দুই দিনে আসামে বাংলাভাষী মুসলমানদের ১ হাজার ১০০টির বেশি বাড়িঘর এবং ১০টিরও বেশি মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে বিভিন্ন উচ্ছেদ অভিযানে ২২ হাজারের বেশি পরিবার গৃহহীন হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি অভিযোগ করেন, আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার নেতৃত্বে বিজেপির রাজনীতিতে জাতিগত পরিচয়ের প্রশ্নটি ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এর ফলে বাংলাভাষী মুসলমানরা বিশেষভাবে হয়রানি ও উচ্ছেদের শিকার হচ্ছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নাহিদ ইসলামের ভাষ্য, আসামে নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্ক, জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) থেকে বাদ পড়া মানুষদের অনিশ্চয়তা এবং নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) ঘিরে বিভিন্ন বিধান বাংলাভাষী মুসলমানদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তাঁর অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই মানুষকে সীমান্তের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
আসামের সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, সিলেট ও করিমগঞ্জের ইতিহাস দুই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে গভীর সম্পর্কের সাক্ষ্য বহন করে। ১৯৪৭ সালের গণভোটে সিলেটের অধিকাংশ অঞ্চল পূর্ববঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হলেও করিমগঞ্জের কিছু অংশ আসামের অন্তর্ভুক্ত থেকে যায়। এ কারণে বরাক উপত্যকার মানুষের সংকট বাংলাদেশের মানুষের কাছেও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।
বাংলা ভাষার অধিকার আদায়ের আন্দোলনের ইতিহাসও তুলে ধরেন নাহিদ ইসলাম। তাঁর বক্তব্য, ১৯৬১ সালের ১৯ মে শিলচর রেলস্টেশনে বাংলা ভাষার দাবিতে আন্দোলনরত মানুষের ওপর পুলিশের গুলিতে ১১ জন শহীদ হন। পরবর্তী সময়েও ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এসব ইতিহাস বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানের যৌথ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের অংশ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বাঙালি মুসলমানদের প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, আসামে টিকে থাকার জন্য তাঁদের একটি অংশ অসমীয়া ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তারপরও তাঁদের অনেককে ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, আসামে বাঙালি মুসলমানদের একদিকে জাতিগত পরিচয়, অন্যদিকে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। তাঁর মতে, উগ্র জাতিগত জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের সম্মিলিত প্রভাবে এই জনগোষ্ঠী ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ছে।
এ প্রসঙ্গে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সংগ্রামের কথা উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, আসামে বাঙালি মুসলমান কৃষকদের অধিকার রক্ষা এবং ‘লাইন প্রথা’ ও ‘বাঙাল খেদাও’ রাজনীতির বিরুদ্ধে তাঁর আন্দোলন ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে। ওই অঞ্চলে বাঙালি মুসলমানদের নাগরিক মর্যাদা ও অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে ভাসানীর ভূমিকা অনুসরণযোগ্য বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নাহিদ ইসলামের মতে, আসামের বর্তমান উচ্ছেদ পরিস্থিতি কেবল স্থানীয় কোনো সমস্যা নয়; এটি সীমান্ত, নাগরিকত্ব এবং মানবাধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আসামের বাঙালি মুসলমানদের ভারতের নাগরিক হিসেবে তাঁদের সাংবিধানিক ও আইনি অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এনসিপির এই নেতা। তাঁর বক্তব্য, সীমান্তে সম্ভাব্য জোরপূর্বক প্রবেশ বা ‘পুশইন’ ঠেকাতে শুধু কূটনৈতিক চিঠি যথেষ্ট নয়; এ বিষয়ে আরও দৃঢ় ও স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি আসামের পরিস্থিতি এবং সীমান্ত দিয়ে মানুষকে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশের জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। পাশাপাশি জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মঞ্চে বিষয়টি তুলে ধরা এবং কোনো ধরনের জোরপূর্বক পুশইন বা প্রত্যাবাসন মেনে না নেওয়ার আনুষ্ঠানিক অবস্থান ঘোষণার দাবি জানান।
একই সঙ্গে আসামের পরিস্থিতির প্রভাবে বাংলাদেশে কোনো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা যেন বিঘ্নিত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান নাহিদ ইসলাম। তাঁর মতে, বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা তৈরি হলে তা আসামের বাঙালি মুসলমানদের ওপর নিপীড়নের ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে।
পোস্টের শেষাংশে তিনি বলেন, আসামের বাঙালি মুসলমানদের অধিকার ও ঐতিহাসিক পরিচয়ের প্রশ্নে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, মানবাধিকার এবং কূটনৈতিক দায়িত্বকে গুরুত্ব দিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।








