সেন্টমার্টিন নীল জলরাশি, প্রবাল আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য দ্বীপ। প্রতিবছর অসংখ্য পর্যটক এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে ছুটে যান সেখানে। কিন্তু ভ্রমণের আগে এখন অনেকেরই প্রশ্ন সেন্টমার্টিন যাত্রা কি আনন্দের হবে, নাকি পথের ভোগান্তিই হয়ে উঠবে প্রধান অভিজ্ঞতা?

কক্সবাজার থেকে জাহাজে সেন্টমার্টিন যাওয়ার ব্যবস্থাকে ঘিরে পর্যটকদের একাংশের অভিযোগ, দীর্ঘ অপেক্ষা, অনিশ্চিত যাত্রার সময়, ঘাটে অতিরিক্ত ভিড় এবং জাহাজে ওঠানামার জটিলতা তাদের ভ্রমণকে দুর্বিষহ করে তুলছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক মানুষ ও পরিবার নিয়ে ভ্রমণকারীদের জন্য এসব পরিস্থিতি বাড়তি দুর্ভোগের কারণ হতে পারে। যাত্রার আগে নির্দিষ্ট সময় জানার পরও যদি ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে পর্যটকের অসন্তোষ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।

বাড়তি ভাড়া, কিন্তু সেবার নিশ্চয়তা কোথায়?

পর্যটকদের ক্ষোভের আরেকটি বড় কারণ জাহাজের ভাড়া। অভিযোগ রয়েছে, কয়েক বছরের ব্যবধানে যাওয়া-আসার টিকিটের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অথচ ভাড়া বাড়ার সঙ্গে যাত্রার স্বাচ্ছন্দ্য, সময়ানুবর্তিতা ও যাত্রীসেবার মান একই অনুপাতে উন্নত হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

এখানে মূল বিষয় শুধু ভাড়ার অঙ্ক নয়; বরং যে অর্থ নেওয়া হচ্ছে, তার বিপরীতে যাত্রী কী ধরনের সেবা পাচ্ছেন। জাহাজের সময়সূচি, যাত্রী ধারণক্ষমতা, নিরাপদে ওঠানামা, অপেক্ষার ব্যবস্থা এবং জরুরি চিকিৎসাসুবিধা সবকিছুরই স্বচ্ছ মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন।

যাত্রীসংখ্যা, পরিচালন ব্যয়, পরিবেশগত সীমাবদ্ধতা ও সরকারি নিয়মের ভিত্তিতে ভাড়া নির্ধারণ করা হতে পারে। কিন্তু ভাড়া নির্ধারণের যুক্তি ও হিসাব জনসমক্ষে পরিষ্কার না থাকলে অস্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত ভাড়ার কাঠামো, পরিচালন ব্যয় এবং যাত্রীসেবার মান সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ করা।

বয়কট কি সমাধান, নাকি প্রতিবাদের একটি পথ?

সেন্টমার্টিন ভ্রমণ বয়কটের আহ্বানকে শুধু আবেগের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি মূলত পর্যটকদের অসন্তোষ প্রকাশের একটি প্রস্তাব। ভ্রমণকারীরা যদি মনে করেন, ব্যয় ও ভোগান্তির তুলনায় তারা প্রত্যাশিত সেবা পাচ্ছেন না, তাহলে বিকল্প গন্তব্য বেছে নেওয়া তাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।

তবে বয়কটের প্রভাব পড়তে পারে দ্বীপের স্থানীয় অর্থনীতিতেও। পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল হোটেল, রেস্তোরাঁ, নৌযানসংশ্লিষ্ট কর্মী, দোকানি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা পর্যটক কমে গেলে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। তাই প্রতিবাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত সেবার মান উন্নয়ন, ন্যায্য ভাড়া ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা স্থানীয় মানুষের জীবিকা অনিশ্চিত করে তোলা নয়।

পর্যটকদের অভিযোগ সত্যিই কতটা বিস্তৃত, ভাড়ার বৃদ্ধি কতটা যৌক্তিক এবং যাত্রাপথে কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহও জরুরি। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য সামনে আনা প্রয়োজন।

বিকল্প ঘাট ও যাত্রাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন

কক্সবাজারের বর্তমান ঘাটকেন্দ্রিক ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প জেটি বা যাত্রী ওঠানামার সুবিধা বিবেচনা করা যায় কি না, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা থাকা দরকার। বিকল্প ব্যবস্থা চালুর ক্ষেত্রে নৌনিরাপত্তা, নাব্যতা, অবকাঠামো, পরিবেশ ও আইনগত বিধিনিষেধ বিবেচনা করতে হবে। একইভাবে বিকল্প নৌযান ব্যবহারের সুযোগ থাকলে তা কোন শর্তে দেওয়া সম্ভব, সেটিও স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

পরিবেশ সংরক্ষণ সেন্টমার্টিনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। দ্বীপের জীববৈচিত্র্য ও প্রতিবেশ রক্ষায় পর্যটকের সংখ্যা বা চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে তার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি, বাস্তবায়নপদ্ধতি এবং পর্যটকদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা সম্পর্কে স্বচ্ছতা থাকতে হবে। পরিবেশ রক্ষার নামে অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তি তৈরি করা যেমন কাম্য নয়, তেমনি পর্যটনের স্বার্থে দ্বীপের পরিবেশকে ঝুঁকিতে ফেলাও গ্রহণযোগ্য নয়।

জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন জরুরি

সেন্টমার্টিনে পর্যটন চালু রাখা হবে কি না, কতজন পর্যটক যেতে পারবেন কিংবা কোন পথে যাত্রা হবে এসব সিদ্ধান্তের সঙ্গে পরিবেশ, নিরাপত্তা, স্থানীয় অর্থনীতি ও জনস্বার্থ জড়িত। তাই সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত জরুরি।

কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর থাকা প্রয়োজন: টিকিটের ভাড়া কীভাবে নির্ধারিত হচ্ছে? জাহাজ ছাড়ার নির্দিষ্ট সময় ও যাত্রীসেবার মান নিশ্চিত করার ব্যবস্থা কী? ঘাটে দীর্ঘ অপেক্ষা ও ভিড় কমাতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে? পরিবেশগত বিধিনিষেধের পাশাপাশি পর্যটকদের ভোগান্তি কমানোর পরিকল্পনা কী?

এসব প্রশ্নের জবাব এবং কার্যকর ব্যবস্থা ছাড়া পর্যটকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। অন্যদিকে পর্যটকদেরও যাচাই করা তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত, যাতে কোনো গুজব বা অতিরঞ্জিত অভিযোগের কারণে স্থানীয় মানুষের জীবিকা অযথা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

পরিবেশও রক্ষা করতে হবে

সেন্টমার্টিনের ক্ষেত্রে শুধু পর্যটকের সুবিধা দেখলেই হবে না। দ্বীপটির পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করাও জরুরি। পর্যটকের চাপ কমানোর প্রয়োজন হলে তার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি স্পষ্ট করতে হবে।

পরিবেশ রক্ষা আর পর্যটকের স্বাচ্ছন্দ্যকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে সমাধান খোঁজা ঠিক হবে না। বরং নিরাপদ, নিয়ন্ত্রিত ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থাই হওয়া উচিত লক্ষ্য।

সেন্টমার্টিন শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়; এটি দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ও বহু মানুষের জীবিকার অংশ। পর্যটকের ন্যায্য সেবা, পরিবেশের সুরক্ষা এবং স্থানীয় মানুষের অর্থনৈতিক স্বার্থ এই তিনটির মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করাই হওয়া উচিত নীতিনির্ধারকদের লক্ষ্য। ভ্রমণ যেন বিলাসী ভোগান্তিতে পরিণত না হয়, আবার পর্যটনের চাপেও যেন দ্বীপের প্রকৃতি ধ্বংস না হয় সমাধান খুঁজতে হবে এই দুই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই।

ভ্রমণ যেন বিলাসী ভোগান্তিতে পরিণত না হয় , আবার পর্যটনের চাপেও যেন সেন্টমার্টিনের প্রকৃতি নষ্ট না হয় সমাধান খুঁজতে হবে এই দুই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই।


মামুনুর রশিদ খাঁন: সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত), দুরবীন নিউজ।