ফুডপান্ডার মাধ্যমে খাবার বিক্রির পর কমিশন বাদ দিয়ে রেস্তোরাঁ মালিকের হাতে যা থাকে সেই অর্থ থেকে খাবার তৈরির উপকরণ, কর্মীদের বেতন, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ও প্যাকেজিং-সহ অন্যান্য খরচ মেটাতে হয়। এর বাইরে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে গ্রাহককে টাকা ফেরত দেওয়া, অপেক্ষার মাশুল, কার্ডে মূল্য পরিশোধের চার্জসহ বিভিন্ন খাতে অর্থ কেটে নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন চট্টগ্রামের রেস্তোরাঁ মালিকেরা।
তাদের দাবি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে কমিশন ও অন্যান্য চার্জ মিলিয়ে বিক্রয়মূল্যের প্রায় ৩২ শতাংশ পর্যন্ত কেটে নেওয়া হচ্ছে। খাবার প্রস্তুত করতে একটু দেরি হলেও জরিমানা দিতে হচ্ছে রেস্তোরাঁকে। এছাড়া খাবারের মান কিংবা কোনো আইটেম না পাওয়ার অভিযোগ উঠলে যথাযথ যাচাই ছাড়াই টাকা ফেরত নেওয়া হচ্ছে।
কমিশনের হার নির্ধারণে বৈষম্য, ইনভয়েসের জটিলতা এবং বাতিল অর্ডারের ক্ষতি নিয়েও রয়েছে অসন্তোষ। এসব বিরোধের সমাধান চেয়ে ৬ অক্টোবর থেকে ফুডপ্যান্ডার সেবা বর্জনের কর্মসূচি শুরু করেছেন চট্টগ্রামের রেস্তোরাঁ মালিকেরা।
তাদের দাবি, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিক্রি বাড়লেও কমিশন ও নানা খরচ বাদ দিয়ে প্রকৃত মুনাফা কত থাকছে, সেই হিসাবই এখন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চট্টগ্রামের সাদিয়াস কিচেনের ২০টি শাখায় এত দিন ফুডপান্ডার সেবা চালু ছিল। প্রতিষ্ঠানটির অপারেশন ম্যানেজার মাসুদ হাসান কাঞ্চন জানান, ফুডপান্ডার মাধ্যমে যেমন তাদের ব্যবসা হচ্ছে, তেমনি তাদের মাধ্যমেও প্ল্যাটফর্মটির ব্যবসা হচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন চার্জ আরোপের কারণে ব্যবসা করে লাভ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। খাবারের দাম না বাড়ালেও কমিশন, অপেক্ষার মাশুল ও গ্রাহককে টাকা ফেরত দেওয়ার খরচ বহন করতে হচ্ছে তাদের।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ফুডপান্ডা এমন কিছু চার্জ আরোপ করছে, যার ফলে ব্যবসা করে লাভ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আমরা খাবারের দাম বাড়াইনি, অথচ কমিশন, অপেক্ষার মাশুল ও গ্রাহককে টাকা ফেরত দেওয়ার খরচ বহন করতে হচ্ছে।
২০০ টাকার খাবারে হাতে থাকে ১৪৮ টাকা
মাসুদ হাসান কাঞ্চন জানান, ফুডপান্ডাকে সব মিলিয়ে তারা ২৬ থেকে ২৮ শতাংশ কমিশন দেন। এর মধ্যে মূল্য সংযোজন কর, কর ও সেবামাশুল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তার দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০০ টাকায় একটি বিরিয়ানি বিক্রি করলে ২৬ শতাংশ কমিশন বাদ দিয়ে হাতে থাকে ১৪৮ টাকা। অথচ খাবার তৈরির উপকরণেই বিক্রয়মূল্যের ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ খরচ হয়ে যায়। বাকি অর্থ থেকে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, কর্মীদের বেতন ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় মেটাতে হয়। এরপরও বিভিন্ন খাতে অর্থ কাটা হলে প্রকৃত মুনাফা খুবই সীমিত হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি চট্টগ্রাম মহানগরের অর্থ সম্পাদক সুমন চৌধুরীর অভিযোগ, কমিশনের বাইরে বিভিন্ন চার্জ যোগ হওয়ায় রেস্তোরাঁর প্রকৃত প্রাপ্তি আরও কমে যাচ্ছে। তার দাবি, কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ২০ শতাংশ কমিশন নির্ধারণ করা হলেও কমিশনের ওপর ১৫ শতাংশ হারে মূল্য সংযোজন কর, কার্ডে মূল্য পরিশোধের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত দেড় শতাংশ চার্জ, ক্যাপ চার্জ ও সিগনেচার চার্জসহ বিভিন্ন খাতে অর্থ কাটা হচ্ছে। সব মিলিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে মোট চার্জের পরিমাণ প্রায় ৩২ শতাংশে দাঁড়ায়।
সুমন চৌধুরী বলেন, আমাদের দাবি, কমিশন একেবারে নির্দিষ্ট হতে হবে। যেমন, কমিশন ২০ শতাংশ হলে প্রতি ১০০ টাকার বিক্রিতে ২০ টাকা নেওয়া যাবে। এর বাইরে কোনো অতিরিক্ত অর্থ কাটা যাবে না। রেস্তোরাঁ মালিকেরা সম্মিলিত আন্দোলনের মাধ্যমে নিজেদের বিক্রির ওপর মূল্য সংযোজন কর ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশে এনেছেন। কিন্তু ফুডপ্যান্ডার কমিশনের ওপর ১৫ শতাংশ হারে মূল্য সংযোজন কর নেওয়া হচ্ছে। কমিশনের বাইরে বিভিন্ন চার্জ যোগ হওয়ায় চুক্তিতে নির্ধারিত হারের সঙ্গে বাস্তবে মোট কর্তনের পার্থক্য তৈরি হচ্ছে।
বড় প্রতিষ্ঠানে কম, নতুন উদ্যোক্তাদের বেশি কমিশন
কমিশনের হার নির্ধারণে প্রতিষ্ঠানভেদে বৈষম্যের অভিযোগও তুলেছেন রেঁস্তোরা মালিক সমিতির নেতারা। তারা জানান, ফুডপ্যান্ডা যখন প্রথম বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করে, তখন তাদের সেবা ভালো ছিল এবং কমিশনও তুলনামূলক কম ছিল। শুরুর দিকে প্রায় সব ক্ষেত্রেই কমিশন ছিল ১০ শতাংশ। ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত, এমনকি ২০২১ সাল পর্যন্তও পরিস্থিতি অনেকটা এ রকম ছিল। তখন বাংলাদেশের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান সহজ ফুডও বাজারে ছিল। বর্তমানে বড় ও প্রতিষ্ঠিত রেস্তোরাঁগুলো তুলনামূলক কম কমিশনে ব্যবসা করার সুযোগ পেলেও ছোট প্রতিষ্ঠান ও নতুন উদ্যোক্তাদের বেশি কমিশন দিতে হচ্ছে।
রেঁস্তোরা মালিক সমিতির নেতা সুমন চৌধুরী ঢাকা পোস্টকে বলেন, ঢাকার স্টার কাবাবের মতো বড় প্রতিষ্ঠান এখনো মাত্র ৮ শতাংশ কমিশন দেয়। আরও কিছু প্রতিষ্ঠান ১০ থেকে ১২ শতাংশ কমিশন দেয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা ১৮ শতাংশ পর্যন্ত। অথচ নতুন করে ফুডপান্ডার সঙ্গে নতুন যুক্ত হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে ফুডপান্ডা তাদের প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগাচ্ছে। কিন্তু এই প্রতিযোগিতার চাপ গিয়ে পড়ছে ছোট উদ্যোক্তাদের ওপর। নতুন উদ্যোক্তাদের পক্ষে এত বেশি কমিশন দিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন।
তিনি আরও বলেন, ফুডপান্ডা প্রথম কয়েক বছর প্রচুর অর্থ ব্যয় করে বাজার তৈরি করেছে এবং গ্রাহকদের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে অভ্যস্ত করেছে। তাদের মূল মালিক জার্মানির। সহজ ফুড ও উবার ইটসের মতো প্রতিষ্ঠানও একসময় এ বাজারে ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকতে পারেনি। বর্তমানে প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান কমে যাওয়ায় রেস্তোরাঁভেদে ইচ্ছেমতো কমিশন নিচ্ছে ফুডপান্ডা।
সুমন চৌধুরী বলেন, সাধারণ খাবারের হোটেল ও অভিজাত রেস্তোরাঁর ব্যবসার সক্ষমতা এক নয়। তাই কমিশন নির্ধারণে রেস্তোরাঁর ধরন ও আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তার দাবি, কমিশন ১৫ থেকে ২৫ শতাংশের মধ্যে রাখতে হবে এবং কোন প্রতিষ্ঠান কী হারে কমিশন দেবে, তা স্বচ্ছ ও নির্দিষ্ট নিয়মের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে।
দেরি হলে জরিমানা রেস্তোরাঁর
কমিশনের বাইরে নতুন করে যুক্ত হওয়া অপেক্ষার মাশুল নিয়েও ক্ষোভ জানিয়েছেন রেস্তোরাঁ মালিকরা। তারা জানান, সপ্তাহের কিছু দিনে অর্ডারের চাপ বেশি থাকে। ফুডপান্ডা এখন রাইডারের অপেক্ষার মাশুল হিসেবে প্রথম আট মিনিটের জন্য ২৩ বা ২৫ টাকা এবং পরবর্তী প্রতি মিনিটের জন্য পাঁচ টাকা করে কাটছে।
সাদিয়াস কিচেনের পরিচালক মেজবাউল হক মাখন ঢাকা পোস্টকে বলেন, অনেক সময় আমরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে খাবার প্রস্তুত করে রাখার পরও রাইডার দেরিতে আসেন। রাস্তায় যানজট, বৃষ্টি কিংবা মোটরসাইকেলে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে রাইডারের দেরি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে রেস্তোরাঁ মালিকরা জরিমানা পান না। আমরা খাবার প্রস্তুত করতে দেরি করলে জরিমানা দিতে রাজি আছি। কিন্তু রাইডারের দেরির জন্যও জরিমানা আরোপ করতে হবে।
তিনি বলেন, চুক্তির বাইরে গিয়ে ই-মেইল পাঠিয়ে রেস্তোরাঁগুলোর ওপর একতরফাভাবে এই অপেক্ষার মাশুল আরোপ করা হয়েছে। একটি রেস্তোরাঁ ১০ মিনিটের মধ্যে খাবার প্রস্তুত করে রাখলেও রাইডার আসতে আধা ঘণ্টা দেরি করতে পারেন। এতে খাবারের উষ্ণতা ও গুণগত মান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অথচ রাইডারের দেরির জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা নেই। অংশীদারত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত ব্যবসায় এ ধরনের একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য নয়। জরিমানা আরোপের নিয়ম থাকলে তা উভয় পক্ষের জন্য সমান ও ভারসাম্যপূর্ণ হতে হবে।
ফুডপান্ডার ইনভয়েসের জটিল হিসাব বুঝতে বিপাকে ব্যবসায়ীরা
ফুডপান্ডার ইনভয়েস বা বিলের বিবরণী নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন রেস্তোরাঁ মালিকেরা। তারা জানান, ইনভয়েসে কমিশন, ছাড়, কর ও অন্যান্য চার্জের হিসাব এত জটিলভাবে দেওয়া হয় যে অনেক রেস্তোরাঁ মালিক প্রকৃত পাওনা বুঝতে পারেন না। হিসাব বুঝতে না পেরে অনেকে অভিযোগও করেন না; বরং ইনভয়েসে দেখানো অর্থ মেনে নেন। এতে বিভিন্ন চার্জের নামে অতিরিক্ত অর্থ কাটা হলেও তা সব সময় শনাক্ত করা সম্ভব হয় না।
রেঁস্তোরা মালিক সমিতির নেতা সুমন চৌধুরী বলেন, পিৎজা হাটের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে শুনেছি, বাংলাদেশজুড়ে তাদের ১৮ জন হিসাব বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। তারাও ফুডপ্যান্ডার ইনভয়েসের হিসাব বুঝতে গিয়ে সমস্যায় পড়েন।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি জানান, ২০২১ সালে নিজের একটি আউটলেটের মাত্র তিন মাসের হিসাব পরীক্ষা করে ফুডপ্যান্ডার কাছে প্রায় ৪০ হাজার টাকা পাওনা থাকার বিষয়টি দেখতে পান। তার সঙ্গে আলোচনা না করেই বিভিন্ন অফার দেওয়া হয়েছিল। সেই অফারের ব্যয় বাবদ তার হিসাব থেকে টাকা কাটা হলেও তা এখনো ফেরত পাননি।
তার দাবি, চট্টগ্রামের অনেক রেস্তোরাঁর ক্ষেত্রেও মাস শেষে হিসাব মেলাতে গিয়ে প্রত্যাশিত পাওনার সঙ্গে বাস্তবে পাওয়া অর্থের বড় পার্থক্য দেখা যায়। এ কারণে প্রতিটি অর্ডারের বিক্রয়মূল্য, কমিশন, ছাড়, কর, অন্যান্য চার্জ এবং চূড়ান্ত পাওনার পরিমাণ আলাদাভাবে উল্লেখ করে সহজবোধ্য ইনভয়েস দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
অর্ডার বাতিল হলেও ক্ষতির দায় রেস্তোরাঁর
রাইডার খাবার নিতে না আসা কিংবা দেরিতে আসার কারণে গ্রাহক অর্ডার বাতিল করলে সেই ক্ষতির দায় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন রেস্তোরাঁ মালিকেরা। তারা জানান, রাতে রাইডার খাবার নিতে না এলে রেস্তোরাঁর কর্মীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। একপর্যায়ে গ্রাহক অপেক্ষা করতে করতে অর্ডার বাতিল করে দেন। তখন খাবার ফেরত নেওয়া অথবা খাবারের মূল্যের ৪০ শতাংশ ফেরত পাওয়ার মতো বিকল্প দেওয়া হয়।
মালিক সমিতির নেতা সুমন চৌধুরী বলেন, বর্তমানে কাঁচামালের দাম অনেক বেশি। রেস্তোরাঁভেদে খাবারের উৎপাদন খরচ বিক্রয়মূল্যের ৮০ শতাংশেরও বেশি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে খাবারের মূল্যের ৪০ শতাংশ ফেরত দিয়ে বাকি ক্ষতির দায় রেস্তোরাঁর ওপর চাপানো কতটা যৌক্তিক, সেই প্রশ্ন থেকে যায়। তার দাবি, কখনো কখনো রাতে পাঁচ হাজার টাকার অর্ডারও বাতিল হয়ে যায়। ফুডপ্যান্ডাকে কমিশন দেওয়ার পরও রাইডার খাবার নিতে না আসার কারণে ক্ষতি রেস্তোরাঁ মালিকদের বহন করতে হচ্ছে।
গ্রাহকের অভিযোগেই টাকা ফেরত, রেঁস্তোরা কতৃপক্ষের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ নেই
খাবারের মান খারাপ, কোনো আইটেম না পাওয়া কিংবা খাবারের পরিমাণ নিয়ে অভিযোগ উঠলে রেস্তোরাঁর বক্তব্য শোনার আগে টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়েও আপত্তি রয়েছে ব্যবসায়ীদের।
সংশ্লিষ্টরা জানান, কখনো খাবারের ছবি না দিয়ে শুধু ঢাকনা লাগানো প্যাকেটের ছবি দেখিয়েই অভিযোগ করা হয়। এরপর যথাযথ যাচাই ছাড়াই রেস্তোরাঁর বিল থেকে টাকা কেটে গ্রাহককে ফেরত দেওয়া হয়।
রেঁস্তোরা কর্মকর্তা মাসুদ হাসান কাঞ্চন বলেন, আমরা ফুডপ্যান্ডার কার্যালয়ে গিয়ে বলেছি, এ ধরনের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের নাম ও যোগাযোগের নম্বর আমাদের দিতে হবে। আমাদের ভুল থাকলে আমরা গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলে সমস্যার সমাধান করব। প্রয়োজনে একটি আইটেমের পরিবর্তে দুটি আইটেম নিজেদের খরচে দিয়েও গ্রাহককে সন্তুষ্ট করব। কিন্তু ফুডপান্ডা গ্রাহকের তথ্য দিচ্ছে না।
রেঁস্তোরা মালিকেরা জানান, গ্রাহকের অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে রেস্তোরাঁকে যুক্ত করার জন্য তারা একটি প্রস্তাব দিয়েছেন। অভিযোগ পাওয়ার পর আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টার মধ্যে রেস্তোরাঁর প্রতিনিধি নিজ খরচে গ্রাহকের কাছে গিয়ে খাবার পরীক্ষা করবেন। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে খাবার পরিবর্তন করে দেওয়া কিংবা টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। কিন্তু ফুডপ্যান্ডা আন্তর্জাতিক নীতিমালার কথা বলে গ্রাহকের পরিচয় ও যোগাযোগের তথ্য দিতে চায় না।
আবার রাইডারের চুরির কারণেও অনেক সময় গ্রাহকের কাছে খাবার কম পৌঁছে অভিযোগ রেঁস্তোরা মালিক মেজবাউল হক মাখনের। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, একবার আমাদের রেস্টুরেন্ট থেকে ১০টি শর্মার অর্ডার নিয়ে রাইডার পথে একটি খেয়ে ফেলেন। বাকি নয়টি গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পর রেস্তোরাঁ থেকে খাবার কম দেওয়া হয়েছে বলে গ্রাহক অভিযোগ করেন। পরে সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই করে দেখা যায় রাইডারকে ঠিকই ১০টি শর্মা দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে রাইডার ঘটনা স্বীকারও করেন এবং তাকে জরিমানা করে ফুডপান্ডা কতৃপক্ষ। কিন্তু সেবার ফুটেজ দেখিয়ে প্রকৃত ঘটনা প্রমাণ করা গেলেও ততক্ষণে গ্রাহকের কাছে রেস্তোরাঁর সুনাম নষ্ট হয়ে যায়।
আলোচনায় সমাধান না পেয়ে বর্জন কর্মসূচি
রেঁস্তোরা মালিকেরা জানান, কমিশন ও বিভিন্ন চার্জ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ফুডপ্যান্ডার সঙ্গে আলোচনা করেও তারা কার্যকর সমাধান পাননি। গত ২৮ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের একটি হলে ফুডপান্ডার প্ল্যাটফর্মে যুক্ত শীর্ষ ৩০ বিক্রেতাকে নিয়ে বৈঠক করেন রেস্তোরাঁ মালিকেরা। বৈঠকে ফুডপান্ডার ব্যবস্থাপনা পরিচালককে উপস্থিত থাকতে বলা হলেও তিনি আসেননি। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন বিভাগের প্রধান ও বিক্রয় বিভাগের প্রধানের একজন প্রতিনিধি বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
মালিক সমিতির নেতা সুমন চৌধুরী জানান, বৈঠকে রেস্তোরাঁ মালিকেরা তাদের দাবিগুলো তুলে ধরেন। কিন্তু ফুডপ্যান্ডার প্রতিনিধি সমস্যার সমাধান না দিয়ে বিভিন্ন চার্জের পক্ষে ব্যাখ্যা দেন। এরপরও ফুডপান্ডাকে সাত দিন সময় দেওয়া হয়েছিল। পরে প্রতিষ্ঠানটি আরও সময় চাইলে রেস্তোরাঁ মালিকেরা ক্ষুব্ধ হন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৬ অক্টোবর থেকে চট্টগ্রামের রেস্তোরাঁগুলোকে ফুডপান্ডার ট্যাব বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সুমন চৌধুরীর দাবি, কর্মসূচি ঘোষণার পর ফুডপান্ডা রেস্তোরাঁ মালিকদের আইনি নোটিশ পাঠায়। নোটিশে রেস্তোরাঁ মালিকেরা ইচ্ছামতো এভাবে কার্যক্রম বন্ধ করতে পারেন না বলে জানানো হয়। ৮ অক্টোবরও ছয় দফা দাবির বিপরীতে বিভিন্ন চার্জের ব্যাখ্যা দিয়ে আরেকটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু আমরা চার্জের ব্যাখ্যা নয়, কার্যকর সমাধান চাই।
সুমন চৌধুরী বলেন, আমরা তাদের যথেষ্ট সময় দিয়েছি। বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কথা বলেছি। কিন্তু তারা আমাদের দাবিকে গুরুত্ব দেয়নি। তারা বারবার আমাদের দাবির বিপরীতে ব্যাখ্যা দিচ্ছে, অথচ কার্যকর সমাধান দিচ্ছে না। ফুডপ্যান্ডা আলাদাভাবে রেস্তোরাঁ মালিকদের বিভিন্ন প্রস্তাব বা সুবিধা দিচ্ছে, কিন্তু সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে আলোচনায় বসতে চাইছে না। ব্যক্তিগতভাবে আলাদা আলাদা প্রস্তাব না দিয়ে সব রেস্তোরাঁ মালিকের সঙ্গে একসঙ্গে বসে সমস্যাগুলোর সমাধান করতে হবে।
রেঁস্তোরা মালিকেরা জানান, প্রতিষ্ঠানভেদে সমস্যার ধরন আলাদা হলেও কমিশন, একতরফা অপেক্ষার মাশুল, গ্রাহকের অভিযোগ যাচাই এবং সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ না থাকার বিষয়ে অনেক প্রতিষ্ঠানের আপত্তি রয়েছে। এ কারণে সমিতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে আপাতত ফুডপ্যান্ডার সেবা বন্ধ রাখা হয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য বিরোধ তৈরি করা নয়, বরং আলোচনার মাধ্যমে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো। তবে ফুডপ্যান্ডা আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর ও তাৎক্ষণিক সমাধানের পথ দেখাতে পারেনি।
১৫ অক্টোবরের দিকে তাকিয়ে ব্যবসায়ীরা
রেস্তোরাঁ মালিকদের মূল দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে কমিশনের হার নির্দিষ্ট ও স্বচ্ছ করা, কমিশনের বাইরে বিভিন্ন চার্জের যৌক্তিকতা নিশ্চিত করা, রাইডারের অপেক্ষার মাশুলের ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের জন্য সমান নিয়ম চালু করা, গ্রাহকের অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে রেস্তোরাঁকে যুক্ত করা এবং অর্ডার বাতিলের ক্ষতির ন্যায্য সমাধান করা।
সুমন চৌধুরী বলেন, ফুডপান্ডা কর্তৃপক্ষ দাবিগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাতে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত সময় চেয়েছে। এখন ওই সময়সীমার মধ্যে গ্রহণযোগ্য সমাধান আসে কি না, তার ওপর পরবর্তী কর্মসূচি নির্ভর করছে। দাবি পূরণ না হলে ফুডপ্যান্ডা বর্জনের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা
এদিকে ফুডপান্ডা বাংলাদেশের পাঁচ শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কয়েক কোটি টাকার পণ্য নিয়ে অর্থ পরিশোধ না করা, পণ্য নষ্টের অজুহাতে ভুয়া ফেরত চালান তৈরি এবং চুক্তির বাইরে বিভিন্ন খাতে অর্থ কেটে নেওয়ার অভিযোগে দুটি মামলা হয়েছে। গত বছরের ৩ জুলাই আদালতে মামলা দুটি করেন আইপিইএল ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্কের স্বত্বাধিকারী শিহাব মাহমুদ বশির। এরপর চলতি বছরের জুন ও জুলাইয়ে গুলশান থানা পুলিশ পাঁচ কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করে আদালতে দুটি পৃথক তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম মামলার পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। মামলার আসামিরা হলেন– ফুডপ্যান্ডা বাংলাদেশের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দা আম্বারিন রেজা, সহপ্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক জুবায়ের সিদ্দিকী, পান্ডামার্টের পরিচালক মো. তাবরেজ খান, শ্রেণি ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান দিলারা ফারুক এবং জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সাজেদুল হক।










