নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন অফিসে আবারও দুই রোহিঙ্গা নাগরিকের বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরির অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার রংছাতি ইউনিয়নের শান্তিনগর গ্রামের বাসিন্দা দেখিয়ে নূর হালিমা (২৫) ও মুজিবুর রহমান নামে দুজনের এনআইডি তৈরির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। এর মধ্যে নূর হালিমার এনআইডি গত ১১ আগস্ট হস্তান্তর করা হয়েছে। মুজিবুর রহমানের এনআইডির প্রক্রিয়া শেষ করে নির্বাচন কমিশনের সার্ভারে তথ্য আপলোড করা হলেও বিষয়টি জানাজানি হওয়ায় সেটি এখনো হস্তান্তর করা হয়নি।

নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, মুজিবুর রহমানের ফাইল নম্বর ১২১১৫০৭৯১। তার ঠিকানা হিসেবে রংছাতি ইউনিয়নের শান্তিনগর গ্রামের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। নূর হালিমা ও মুজিবুর রহমানের এনআইডি তৈরির কাগজপত্র গত ১১ আগস্ট রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন অফিসের আইডি থেকে সার্ভারে আপলোড করা হয়। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, ওই রাতে শুধু এই দুজনের তথ্যই আপলোড করা হয়েছিল।

নূর হালিমার এনআইডিতে বাবা হিসেবে শান্তিনগর গ্রামের ওমর আলী এবং মা হিসেবে তার স্ত্রী শরীফা খাতুনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ওমর আলীর দাবি, নূর হালিমা নামে তার কোনো সন্তান নেই।

citytouch 728-X-90

স্থানীয়ভাবে বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর নূর হালিমার এনআইডির একটি কপি নিয়ে শান্তিনগর গ্রামে গিয়ে ওমর আলীর সঙ্গে কথা বলা হয়। তিনি জানান, তার চার সন্তান—দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। ছেলেদের নাম কাওছার মিয়া ও শামীম মিয়া এবং মেয়েদের নাম আসমা আক্তার ও মাইমুনা আক্তার। নূর হালিমা নামে তার কোনো মেয়ে নেই।

ওমর আলী বলেন, কয়েক দিন আগে নির্বাচন অফিসের কয়েকজন ব্যক্তি এ বিষয়ে তার কাছে এসেছিলেন। নূর হালিমা নামে তার কোনো মেয়ে নেই—এ বিষয়ে বিভিন্ন ফরমে তার স্বাক্ষর নেওয়া হয়। এলাকার কয়েকজনের স্বাক্ষরও নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তিনি বিব্রত।

ওমর আলীর ছেলে শামীম মিয়াও দাবি করেন, নূর হালিমা নামে তাদের কোনো বোন নেই। তার অভিযোগ, বাবা-মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে অন্য একজনকে তাদের সন্তান হিসেবে দেখিয়ে কীভাবে এনআইডি তৈরি করা হলো, তা তারা বুঝতে পারছেন না।

স্থানীয় বাসিন্দা জাবেদ মিয়া বলেন, বৈধভাবে একজনের এনআইডি করতে হলে জন্মনিবন্ধন, নাগরিক সনদ, বাবা-মায়ের এনআইডিসহ বিভিন্ন নথি জমা দিতে হয়। এসব নথি যাচাই-বাছাইও করা হয়। তার দাবি, সংশ্লিষ্টদের অজান্তে এ ধরনের এনআইডি তৈরি করা সহজ নয়। তিনি বিষয়টি তদন্ত করে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান।

মুজিবুর রহমানের এনআইডির কপি পাওয়া না যাওয়ায় তার বাবা-মায়ের নাম সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

নির্বাচন অফিস সূত্র জানায়, নতুন ভোটার হতে জন্মনিবন্ধন, বাবা-মায়ের এনআইডি, নাগরিক সনদ, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদসহ বিভিন্ন নথি জমা দিতে হয়। এসব নথি যাচাই-বাছাই ও স্ক্যান করার পর কম্পিউটার অপারেটর নিজস্ব আইডি ব্যবহার করে তথ্য সার্ভারে প্রাথমিকভাবে সংরক্ষণ করেন। পরে নির্বাচন কর্মকর্তা তথ্য যাচাই করে চূড়ান্ত অনুমোদন দেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার সঙ্গে পরিচিত এক ব্যক্তি দাবি করেন, নূর হালিমা ও মুজিবুর রহমান দুজনই রোহিঙ্গা নাগরিক। তাদের এনআইডির কাগজপত্র কলমাকান্দা নির্বাচন অফিসের আইডি থেকে একই রাতে সার্ভারে আপলোড করা হয়েছে।

তার দাবি, রাতে এনআইডির তথ্য আপলোডের নিয়ম না থাকলেও ওই রাতে শুধু এই দুজনের তথ্যই আপলোড করা হয়। স্থানীয় দালালের মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে তাদের এনআইডি তৈরির চুক্তি হয়েছিল বলেও তিনি দাবি করেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা যায়নি।

কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমান বলেন, ওই দুটি জাতীয় পরিচয়পত্র কীভাবে তৈরি হয়েছে, তা তিনি জানেন না। নূর হালিমার এনআইডি হস্তান্তর করা হয়েছে এবং মুজিবুর রহমানের এনআইডি এখনো হস্তান্তর করা হয়নি। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে এবং তদন্ত শেষে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দুই এনআইডি তৈরির নথি দেখতে চাওয়া হলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে তা দেখাতে পারেননি। প্রথমে তিনি জানান, নথিগুলো স্টোরে রাখা আছে এবং অনেক নথির মধ্যে সেগুলো খুঁজে পেতে সময় লাগবে। পরে নথি চাওয়া হলেও সেগুলো পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান তিনি।

পরে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা জানান, ওই দুই ব্যক্তির বিষয়ে এলাকায় খোঁজ নেওয়া হয়েছে। তাদের এনআইডিতে দেওয়া পরিচয়ের সঙ্গে স্থানীয় বাস্তবতার কোনো মিল পাওয়া যায়নি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ভুয়া তথ্য ব্যবহার করে ওই দুই ব্যক্তির এনআইডি তৈরি করা হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে এবং তদন্ত চলছে।

জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ তোফায়েল হোসেন বলেন, এর আগেও কলমাকান্দা নির্বাচন অফিসে একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। এবারও একই ধরনের অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। এ বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না এবং ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে শাস্তির আওতায় আনা হবে।

এর আগে গত ২০ জুলাই কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন অফিসে আউটসোর্সিংয়ে কর্মরত তিনজনের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা নাগরিকদের বাংলাদেশি এনআইডি তৈরি করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় তাদের চাকরিচ্যুত করা হয় এবং তৎকালীন উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকেও বদলি করা হয়েছিল।

এর কয়েক মাসের মধ্যেই একই উপজেলা নির্বাচন অফিসে আবারও দুই ব্যক্তির এনআইডি তৈরির অভিযোগ ওঠায় ভোটার নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির প্রক্রিয়ার নিরাপত্তা ও যাচাই-বাছাই নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিষয়টি তদন্তের পর প্রকৃত ঘটনা এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত, তা স্পষ্ট হবে।