নাটোরের গুরুদাসপুরে ১২৩ বছর বয়সেও চশমা ছাড়াই পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করতে পারা শতবর্ষী আব্বাস আলী প্রামাণিক আর নেই। সোমবার (১২ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে উপজেলার বিয়াঘাট ইউনিয়নের যোগেন্দ্রনগর গ্রামের নিজ বাড়িতে তিনি মারা যান। ভোটার পরিচয়পত্র অনুযায়ী, মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ১২৩ বছর ৪ মাস। তবে পরিবারের দাবি, তাঁর প্রকৃত বয়স আরও বেশি।

আব্বাস প্রামাণিকের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তাঁর নাতি রিপন হোসেন। মৃত্যুকালে তিনি ছয় ছেলে ও দুই মেয়েসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তিনি যোগেন্দ্রনগর গ্রামের মৃত সদর উদ্দিনের ছেলে।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, আব্বাস প্রামাণিক বেশ কিছুদিন আগেও শারীরিকভাবে সুস্থ ছিলেন। তবে রোববার (১১ অক্টোবর) হঠাৎ তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। এ সময় কথাবার্তায় অস্বাভাবিকতা দেখা দেয় এবং একপর্যায়ে তিনি কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেন।

citytouch 728-X-90

পরে তাঁর চিকিৎসার দায়িত্বে থাকা খুবজিপুর প্রবীণ সেবাকেন্দ্র কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়। খবর পেয়ে সেবাকেন্দ্রের পক্ষ থেকে চিকিৎসক পাঠিয়ে তাঁকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

পরিবারের দাবি অনুযায়ী, দীর্ঘ জীবনে আব্বাস আলী প্রামাণিক ব্রিটিশ শাসন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, পাকিস্তান আমল, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধসহ ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন। তাঁর নাতি-নাতনিদের বয়সও ৬০ বছর ছাড়িয়েছে।

ধর্মপরায়ণ ও সদাচারী মানুষ হিসেবে এলাকায় পরিচিত ছিলেন আব্বাস আলী। জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি ধর্মচর্চায় কাটিয়েছেন। বয়সের ভার কিংবা অসুস্থতা—কোনো অবস্থাতেই নামাজের প্রতি তাঁর আগ্রহ কমেনি বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা।

পেশাগত জীবনে তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি বিনামূল্যে শিশু-কিশোরদের পবিত্র কুরআন শিক্ষা দিতেন। এভাবে বহু মানুষকে ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন তিনি।

তাঁর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত দিক ছিল বার্ধক্যেও দৃষ্টিশক্তি ভালো থাকা। ১২৩ বছর বয়সেও চশমা ছাড়াই পবিত্র কুরআন পড়তে পারতেন তিনি। কুরআনের পাতা উল্টে সাবলীলভাবে তিলাওয়াত করার বিষয়টি স্থানীয়দের কাছে বিস্ময়ের কারণ ছিল।

অতি সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন এই প্রবীণ। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, জীবনে কখনো যানবাহনে চড়েননি; পায়ে হেঁটেই বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করতেন। একসময় সংসারে সচ্ছলতা থাকলেও জীবনের শেষ পর্যায়ে একটি জরাজীর্ণ ঘরে বসবাস করতেন তিনি। তবে ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি ও নাতবউদের সেবা-যত্ন পেয়েছেন।

ছয় ছেলে ও দুই মেয়েকে বড় করে বিয়ে দিয়েছিলেন আব্বাস আলী প্রামাণিক। মেয়েরাও সুযোগ পেলেই বাবাকে দেখতে ছুটে আসতেন। তাঁর মৃত্যুতে পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।