উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় মাটির নিচে থাকা মূল্যবান প্রত্নসম্পদ অবৈধভাবে উত্তোলন ও কেনাবেচার অভিযোগ উঠেছে। প্রাচীন কষ্টিপাথরের মূর্তি, বিভিন্ন রঙের মূল্যবান পাথর, স্বর্ণমুদ্রা ও রুপার অলংকার সংগ্রহ করে একটি চক্র বিদেশে পাচার করছে বলে জানা গেছে। নওগাঁর প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বগুড়ার মহাস্থানগড়, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ হয়ে এসব প্রত্নসম্পদ রাজধানী ঢাকায় নেওয়া হচ্ছে। পরে সেগুলো থাইল্যান্ড, চীন ও ভারতের বিভিন্ন বাজারে পাচার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নওগাঁর পোরশা উপজেলার নিতপুরের টেকঠা এলাকায় পুনর্ভবা নদীর তীরবর্তী প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মাটি খুঁড়ে প্রত্নসম্পদ খোঁজা হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, শেরশাহ ও সুজাউদ্দীনের আমলে এ নদী অববাহিকায় ঐতিহাসিক বাণিজ্যকেন্দ্র ও প্রাচীন কালীমন্দিরকেন্দ্রিক জনপদ ছিল। বিভিন্ন সময়ে দেশভাগ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বহু পুরোনো নিদর্শন মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকতে পারে।
কয়েক বছর আগে টেকঠা ভিটায় মাটি কাটার সময় কিছু প্রত্ননিদর্শন পাওয়ার পর সেখানে খননকাজ বেড়ে যায়। প্রতিদিন অনেকে কোদাল ও শাবল দিয়ে চার থেকে পাঁচ ফুট মাটি খুঁড়ে প্রাচীন মুদ্রা, অলংকার, রঙিন পাথর ও কষ্টিপাথরের মূর্তি খোঁজেন। স্থানীয়দের দাবি, বিশেষ ধরনের মাত্র ১০ গ্রাম ওজনের একটি পাথর বিক্রি করেও পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা পাওয়া যায়।
পাশের বিষ্ণুপুর গ্রামের মনিরুল ইসলাম জানান, সাত-আটজন মিলে তিন দিন মাটি খুঁড়ে তাঁরা জালি বল বা ‘দানা’ পান। পরে সেটি জামিরুল নামের এক ব্যক্তির কাছে এক লাখ ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। নিতপুর এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য গামার অভিযোগ, প্রত্নসম্পদ রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ নেই। তিনি অবৈধভাবে প্রত্নসম্পদ উত্তোলন ও পাচারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
মূল্যবান ‘দানা’ পাচারের সঙ্গে দুই ভাইয়ের নেতৃত্বাধীন একটি চক্র জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। নওগাঁর নিতপুর এলাকার নুরুল হুদার দুই ছেলে আমিরুল ও জামিরুল এ চক্র পরিচালনা করেন বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। তাঁদের সঙ্গে মাঠপর্যায়ে আতাউর রহমান মিশু, মোসাদ্দেক ও আতাবুল কাজ করেন বলে অভিযোগ। সংগৃহীত পাথরগুলো বগুড়ার নন্দীগ্রামের কীটনাশক ব্যবসায়ী সবুজের কাছে পৌঁছানো হয়। পরে তিনি ঢাকার ক্রেতা ও বিদেশি ক্রেতাদের কাছে সেগুলো সরবরাহ করেন বলে জানা গেছে।
বগুড়ার প্রাচীন মহাস্থানগড় এলাকাতেও কষ্টিপাথরের মূর্তি ও অন্যান্য প্রত্ননিদর্শন অবৈধভাবে উত্তোলন এবং কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে। এ কাজে সুজন, ধলু, রফিক ও জহুরুলের নাম উঠে এসেছে। তাঁদের সঙ্গে নাটোরের সিংড়া এলাকার পওতা গ্রামের সাইদুর, থাওল গ্রামের মহসিন এবং শেরপুরের ফারুক, সুলতান ও গোপী ঘোষের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, নাটোরের সিংড়ায় মহসিন, তাঁর ছেলে আবু সাঈদ ও সাঈদুল এবং পাটুল এলাকার মামুনের বিরুদ্ধে স্থানীয় পর্যায় থেকে কষ্টিপাথরের মূর্তি সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে। সিরাজগঞ্জের কিছু মধ্যস্বত্বভোগীও এই সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত বলে জানা গেছে।
রাজধানীর গুলশান-২-এর ডিসিসি মার্কেটকেন্দ্রিক একটি চক্রের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা কষ্টিপাথর, ‘দানা’ ও প্রাচীন মূর্তি বিদেশে পাচার করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এই চক্রের সঙ্গে জাকির, তাঁর ছেলে সুমন, সমসের, মামুন, আবুল, তাঁর ছেলে জিতু, নাসরিন ও নান্নুসহ কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে। জাফর নামের চক্রের এক সদস্য অতীতে প্রত্নসম্পদ পাচারের অভিযোগে ভারতে কারাভোগ করেছিলেন বলে জানা গেছে। বর্তমানে তিনি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সামনে একটি পুরোনো কাঁসার দোকান খুলেছেন বলে অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিদেশি ক্রেতারা রাজধানীর বারিধারার স্যুট প্যালেসসহ বিভিন্ন অভিজাত হোটেলে অবস্থান করে লেনদেন চূড়ান্ত করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক এ কে এম সাইফুর রহমান জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে উদ্ধার হওয়া প্রত্ননিদর্শন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে হস্তান্তর করা হয়। ভূগর্ভে পাওয়া ঐতিহাসিক প্রত্নবস্তুর মালিক রাষ্ট্র। কোনো নাগরিক প্রত্ননিদর্শন খুঁজে পেলে তা ব্যক্তিগতভাবে কেনাবেচা করা বা নিজের কাছে রেখে দেওয়া বেআইনি ও দণ্ডনীয় অপরাধ।







