যে বয়সে সহপাঠীদের সঙ্গে খেলাধুলা আর আনন্দে মেতে থাকার কথা, সেই বয়সে বিছানায় শুয়েই দিন কাটছে ৯ বছরের শিশু ফাতেমা আক্তারের। জন্মের পর থেকেই শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগছে সে। ঠিকমতো কথা বলতে পারে না, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অস্বাভাবিকভাবে বড় হচ্ছে মাথা। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, তার হাইড্রোসেফালাস নামের একটি সমস্যা রয়েছে, যেখানে মস্তিষ্কে অতিরিক্ত তরল জমে যায়। শিশুটিকে সুস্থ রাখতে উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন হলেও অর্থের অভাবে তা করাতে পারছে না পরিবার।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের দেওডোবা গ্রামের বাসিন্দা আবুল কালাম ও ফেন্সি বেগম দম্পতির তিন সন্তানের মধ্যে ফাতেমা মেজো।
পরিবারের সদস্যরা জানান, জন্মের পর থেকেই ফাতেমা গুরুতর শারীরিক সমস্যায় ভুগছে। অন্য শিশুদের মতো স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারে না সে। এমনকি ঠিকমতো বসে থাকতেও কষ্ট হয়। দিনের বেশির ভাগ সময় বিছানায় শুয়ে কাটাতে হয় তাকে।
ফাতেমার বাবা আবুল কালামের নিজস্ব কোনো জমি নেই। জীবিকার তাগিদে তিনি ঢাকায় শ্রমিকের কাজ করেন। সীমিত আয়ে সংসারের খরচ চালাতেই তাঁকে হিমশিম খেতে হয়। এর মধ্যে মেয়ের ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ জোগানো তাঁর পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এ কারণে ফাতেমাকে নিয়ে তাঁর মা ফেন্সি বেগম বাবার বাড়িতে থাকছেন।
টিনের জরাজীর্ণ একটি ঘরে মা, নানা-নানি ও মামার সঙ্গে দিন কাটে ফাতেমার। সংসারের অভাব মেটাতে ফেন্সি বেগম মাঝেমধ্যে অন্যের বাড়িতে কাজ করেন এবং নিজের মাকেও কাজে সহযোগিতা করেন। আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের সহায়তা এবং ধারদেনা করে এত দিন মেয়ের চিকিৎসা চালানোর চেষ্টা করেছেন তাঁরা। কিন্তু এখন সেই পথও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে ফাতেমার মা ফেন্সি বেগম বলেন, মেয়েটি জন্মের পর থেকেই কথা বলতে পারে না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মাথাও বড় হচ্ছে। অনেক কষ্ট করে এত দিন চিকিৎসা করিয়েছেন এবং ধারদেনা করেছেন। চিকিৎসকেরা তাকে ঢাকায় নিয়ে উন্নত চিকিৎসা করানোর পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু সেই খরচ বহন করার সামর্থ্য তাঁদের নেই। মেয়েটি সুস্থ হয়ে উঠুক—এটাই তাঁর একমাত্র চাওয়া।
ফাতেমার নানি খতেজা বেগমও অভাবের সঙ্গে লড়াই করে জীবন কাটাচ্ছেন। শীত মৌসুমে হাসানগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনের পাশে খোলা আকাশের নিচে পিঠা তৈরি করে বিক্রি করেন তিনি। কখনো আবার গ্রামে গ্রামে ঘুরে পিঠা বিক্রি করে সংসারের খরচ জোগান।
খতেজা বেগম বলেন, ছোটবেলা থেকেই নাতনিকে অসুস্থ দেখে আসছেন। পিঠা বিক্রি করে যে আয় হয়, তা দিয়ে নিজের সংসার চালানোই কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে নাতনির উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।
ফাতেমার নানা হযরত আলীও বয়সের ভারে প্রায় অচল। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি কোনো কাজ করতে পারেন না। নাতনির কষ্ট দেখেও অসহায়ভাবে দিন কাটাতে হচ্ছে তাঁকে।
পরিবারটির আরেক ভরসা ফাতেমার মামা হারুন মিয়া। তিনি শ্রবণ ও বাক্প্রতিবন্ধী। ধারদেনা করে এবং এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে একটি অটোভ্যান চালান। সেই সামান্য আয় থেকে নিজের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের পাশাপাশি বোনের পরিবারকেও সহযোগিতা করার চেষ্টা করেন তিনি।
বামনডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল জব্বার বলেন, ফাতেমার পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার বিষয়টি তিনি জানেন। শিশুটির চিকিৎসায় কীভাবে সহযোগিতা করা যায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলবেন। সরকারি সুযোগ-সুবিধার আওতায় পরিবারটিকে সহায়তা করার পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদেরও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা কাজী মো. আবুল মনসুর জানান, ফাতেমার অসুস্থতার বিষয়টি তিনি জানতে পেরেছেন। শিশুটি প্রতিবন্ধী হওয়ায় ইতোমধ্যে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের জরিপের আওতায় এনে তার জন্য প্রতিবন্ধী ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ফাতেমার চিকিৎসার জন্য অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন হলে পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত আবেদন করতে হবে। উপজেলা ও জেলা সমাজকল্যাণ কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বরাদ্দ থাকা তহবিল থেকে সাধ্যমতো সহায়তার চেষ্টা করা হবে। এ ছাড়া পরিবারের কোনো কর্মক্ষম সদস্য থাকলে প্রতিবন্ধীদের জন্য পরিচালিত ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির আওতায় আবেদন করার সুযোগ রয়েছে।
অর্থের অভাবে ৯ বছরের ফাতেমার চিকিৎসা যেন থেমে না যায়, সে জন্য সমাজের হৃদয়বান ও সামর্থ্যবান মানুষের সহযোগিতা কামনা করেছে তার পরিবার ও এলাকাবাসী। তাঁদের আশা, সম্মিলিত সহায়তায় ফাতেমা উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পাবে এবং ফিরে পাবে সুস্থ জীবনের সম্ভাবনা।
ফাতেমার পরিবারের সাথে যোগাযোগের মোবাইল নম্বর - ০১৭৯৪৮৮৩৭৩২ ।









