ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি ঘিরে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা জোরালো হয়েছে। ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিরোধীদের আপত্তির মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, আইন অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে কীভাবে অপসারণ করা সম্ভব।
গত কয়েক মাসে ভোটার তালিকা সংশোধনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নির্বাচন কমিশনের ভেতরে মতবিরোধের অভিযোগ সামনে এসেছে। বিরোধী দল কংগ্রেসসহ কয়েকটি রাজনৈতিক পক্ষ এবং তরুণদের সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি জানিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ভারতের সংবিধান ও সংশ্লিষ্ট আইনে নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ, অপসারণ এবং আইনি সুরক্ষার বিধানগুলো নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
কীভাবে নিয়োগ পান নির্বাচন কমিশনাররা?
ভারতের সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নির্বাচন পরিচালনা, তদারকি ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। সংসদে প্রণীত আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ দেন।
২০২৩ সালে অনুপ বরনওয়াল বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া মামলায় ভারতের সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ নির্দেশ দিয়েছিলেন, সংসদ এ বিষয়ে আইন প্রণয়ন না করা পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের সুপারিশ করবে একটি কমিটি। ওই কমিটিতে প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা এবং ভারতের প্রধান বিচারপতির থাকার কথা বলা হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে সংসদে ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার আইন, ২০২৩’ পাস হয়। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আইনটি কার্যকর হয়। নতুন আইনে নিয়োগের সুপারিশকারী কমিটি থেকে প্রধান বিচারপতিকে বাদ দেওয়া হয়। তাঁর পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার একজন সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এ ছাড়া কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি সার্চ কমিটি সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্য থেকে পাঁচজনের তালিকা তৈরি করে সুপারিশকারী কমিটির বিবেচনার জন্য পাঠায়।
নিয়োগের এই নতুন পদ্ধতি নিয়েও সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর এ-সংক্রান্ত মামলাগুলো বৃহত্তর সাংবিধানিক বেঞ্চে পাঠানো হবে কি না, সে বিষয়ে দুই বিচারপতির একটি বেঞ্চ বিভক্ত রায় দেন।
কীভাবে অপসারণ করা যায় প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে?
ভারতের সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের মতোই বিশেষ সাংবিধানিক সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। ফলে কেবল রাজনৈতিক চাপ বা পদত্যাগের দাবি উঠলেই তাঁকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া যায় না।
প্রমাণিত অসদাচরণ বা অক্ষমতার ভিত্তিতে নির্ধারিত সংসদীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণ করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে ১৯৬৮ সালের বিচারপতি (তদন্ত) আইনে নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়।
অপসারণের প্রস্তাব সংসদের লোকসভা ও রাজ্যসভা—উভয় কক্ষেই নির্ধারিত বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস হতে হবে। অর্থাৎ, একটি কক্ষে প্রস্তাব গৃহীত হলেই অপসারণ সম্পন্ন হবে না। দুই কক্ষের অনুমোদন পাওয়ার পর রাষ্ট্রপতি অপসারণের আদেশ জারি করতে পারেন।
অন্য নির্বাচন কমিশনারদের ক্ষেত্রে নিয়মটি ভিন্ন। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সুপারিশ ছাড়া তাঁদের অপসারণ করা যায় না। এর মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও কমিশনারদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সুরক্ষা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে কি গ্রেফতার করা যায়?
২০২৩ সালের আইনের ১৬ নম্বর ধারায় দায়িত্ব পালনের সময় গৃহীত পদক্ষেপ, সম্পাদিত কাজ বা দেওয়া বক্তব্যের জন্য বর্তমান ও সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্য নির্বাচন কমিশনারদের দেওয়ানি ও ফৌজদারি কার্যক্রম থেকে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে।
তবে এই ধারায় গ্রেফতার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ—এমন কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়নি। একইভাবে তদন্ত বা পুলিশি হেফাজতের বিষয়েও সরাসরি বিস্তারিত বিধান নেই। তাই এই আইনি সুরক্ষাকে সব পরিস্থিতিতে গ্রেফতার থেকে সম্পূর্ণ দায়মুক্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না।
এ ছাড়া আইনি সুরক্ষাটি মূলত তাঁদের সরকারি দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কহীন কোনো কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে এই সুরক্ষা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য হবে কি না, তা সংশ্লিষ্ট আইন ও পরিস্থিতির ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে।
সব মিলিয়ে, ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের জন্য সংবিধানে কঠোর প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়েছে। পদত্যাগের দাবি বা রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে অসদাচরণ কিংবা অক্ষমতার প্রমাণ এবং সংসদের উভয় কক্ষের নির্ধারিত সংখ্যাগরিষ্ঠতার অনুমোদন ছাড়া তাঁকে অপসারণ করা সহজ নয়।










