২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় দেশের সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং চারটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে থ্রিজি ও ফোরজি ইন্টারনেট সেবা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিলেন তৎকালীন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে এ তথ্য জানিয়েছেন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) উপপরিচালক মাহদী আহমদ।
রোববার (১২ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সাক্ষ্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন। গণ-অভ্যুত্থানের সময় মাহদী আহমদ বিটিআরসির ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশনস বিভাগে উপপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে করা মামলার সাক্ষী তিনি।
জবানবন্দিতে মাহদী আহমদ বলেন, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার পর বিটিআরসির তৎকালীন মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোস্তাফিজার রহমান তাঁকে হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করেন। সে সময় তাঁকে জানানো হয়, তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে পাঁচটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে থ্রিজি ও ফোরজি নেটওয়ার্ক বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন।
সাক্ষীর ভাষ্য অনুযায়ী, এ নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে বিটিআরসির মহাপরিচালক মোবাইল অপারেটরদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে নির্দেশনা পাঠান। পরে ফোন করে বিষয়টি তাঁকে অবহিত করা হয়।
মাহদী আহমদ আরও বলেন, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই দেশের সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং চারটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে একইভাবে থ্রিজি ও ফোরজি ইন্টারনেট সেবা বন্ধের নির্দেশনা দেওয়া হয়। তাঁর জবানবন্দি অনুযায়ী, তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী পলক বিটিআরসির চেয়ারম্যানকে এ নির্দেশনা দিয়েছিলেন। চেয়ারম্যান তা মহাপরিচালককে জানান এবং মহাপরিচালক মোবাইল অপারেটরগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করা হয়।
সাক্ষী জানান, ১৬ জুলাই সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে তিনি এ নির্দেশনার বিষয়ে জানতে পারেন। সে সময় দাপ্তরিক কাজে তিনি কার্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন।
ওই দিন একটি পূর্বনির্ধারিত উচ্চপর্যায়ের সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথাও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন মাহদী আহমদ। তিনি জানান, সভায় তৎকালীন আইসিটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় ও প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক অনলাইনে অংশ নেন। সভায় তাঁর একটি আলোচ্যসূচি থাকায় তিনি সংশ্লিষ্ট নথি তৈরি করে মহাপরিচালকের কাছে সরবরাহ করেছিলেন। তবে তিনি নিজে সভায় উপস্থিত ছিলেন না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সেদিন ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক বন্ধের বিষয়ে নথিতে পরে অনুমোদন নেওয়া হয়।
জবানবন্দিতে ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই বিটিআরসির আগারগাঁও কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত আরেকটি সভার কথাও তুলে ধরেন মাহদী আহমদ। তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী পলকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় ডিজিএফআই, এনএসআই, এনটিএমসি, আর্থিক সেবাসংশ্লিষ্ট সংস্থা এবং মোবাইল অপারেটরগুলোর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন বলে জানান তিনি।
সাক্ষীর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সভায় পলক এনটিএমসির তৎকালীন মহাপরিচালক জিয়াউল আহসানকে চারটি মোবাইল অপারেটরের থ্রিজি ও ফোরজি নেটওয়ার্ক চালুর নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে বিটিআরসিকে ফেসবুক, টিকটক, আকামাই ও বাইসানের ক্যাশ সার্ভার বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
পরে ৩১ জুলাই এসব ক্যাশ সার্ভার পুনরায় চালু করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন মাহদী আহমদ।
ট্রাইব্যুনালে দেওয়া সাক্ষ্যে উঠে আসা এসব তথ্য জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ইন্টারনেট সেবা নিয়ন্ত্রণ এবং সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেছে। তবে মামলার অভিযোগ ও সাক্ষ্যের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।










