৭২ ঘণ্টার প্রস্তুতির পরামর্শ কেন? খাবার-পানি ও ওষুধ মজুতের পরামর্শ আসন্ন যুদ্ধের ঘোষণা নয়; দুর্যোগ, সাইবার হামলা ও নিরাপত্তাঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে বিভিন্ন দেশ। এর প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্যেও।
ইউরোপের নাগরিকদের অন্তত ৭২ ঘণ্টার খাবার, পানি, ওষুধ ও জরুরি প্রয়োজনীয় সামগ্রী ঘরে রাখার পরামর্শ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিষয়টি সামনে আসার পর অনেকের মনে প্রশ্ন উঠেছে ইউরোপ কি বড় কোনো যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে?
প্রথমেই পরিষ্কার করা দরকার, ৭২ ঘণ্টার জরুরি প্রস্তুতির পরামর্শ মানেই যুদ্ধ আসন্ন এমন ঘোষণা নয়। ২০২৫ সালের ২৬ মার্চ ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ‘প্রিপেয়ার্ডনেস ইউনিয়ন স্ট্র্যাটেজি’ ঘোষণা করে। এর লক্ষ্য যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সাইবার হামলা, মহামারি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো সংকট মোকাবিলায় ইউরোপের প্রস্তুতি বাড়ানো।
ইউরোপীয় কমিশনের কৌশলে নাগরিকদের অন্তত ৭২ ঘণ্টা স্বনির্ভর থাকার সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ বড় কোনো বিপর্যয়ের পর উদ্ধারকাজ, হাসপাতাল, বিদ্যুৎ, পানি ও খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হতে পারে। নাগরিকদের হাতে প্রয়োজনীয় সামগ্রী থাকলে জরুরি সেবার ওপর তাৎক্ষণিক চাপ কমানো সম্ভব।
কী কী মজুত রাখতে বলা হচ্ছে?
জরুরি প্রস্তুতির তালিকায় শুধু খাবার নয়, রয়েছে পানীয় জল, দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য খাবার, নিয়মিত প্রয়োজনীয় ওষুধ, টর্চলাইট, অতিরিক্ত ব্যাটারি, চার্জ দেওয়া পাওয়ার ব্যাংক, রেডিও, নগদ অর্থ এবং পরিচয়পত্রের মতো জরুরি কাগজপত্র।
অর্থাৎ, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ বা দোকানপাটের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলেও যেন একটি পরিবার কয়েক দিন নিরাপদে থাকতে পারে, সেটিই এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।
দেশভেদে প্রস্তুতির সময়সীমা আলাদা
বিভিন্ন দেশের সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতির সময়সীমা এক নয়। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সে তিন দিনের প্রস্তুতির পরামর্শ রয়েছে। সুইডেন ও নরওয়েতে প্রায় এক সপ্তাহ এবং জার্মানিতে ১০ দিনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ওয়েবসাইট ‘রেডি ডট গভ’-এও কয়েক দিন চলার মতো খাবার, পানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রস্তুত রাখার নির্দেশনা রয়েছে। কানাডা, জাপান, মেক্সিকো ও নেদারল্যান্ডসেও জরুরি সরবরাহ প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।
তবে সব দেশের নির্দেশনার কারণ এক নয়। জাপানের মতো ভূমিকম্পপ্রবণ দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ। আবার ইউরোপের কয়েকটি দেশের নির্দেশনায় যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যে জরুরি পণ্যের বিক্রি বেড়েছে
যুক্তরাজ্য সরকার গত ২২ অক্টোবর ‘বি রেডি’ নামে একটি প্রচারাভিযান শুরু করে। এতে নাগরিকদের অন্তত ৭২ ঘণ্টা বা তিন দিন নিজেদের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর মতো সামগ্রী প্রস্তুত রাখতে বলা হয়।
নির্দেশনায় একজনের জন্য প্রতিদিন তিন লিটার পানীয় জল, সহজে নষ্ট হয় না এমন খাবার, প্রয়োজনীয় ওষুধ, টর্চলাইট, অতিরিক্ত ব্যাটারি, পাওয়ার ব্যাংক এবং ব্যাটারিচালিত বা হাতল ঘুরিয়ে চালানো যায় এমন রেডিও রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ব্রিটিশ সরকারের আহ্বানের পর দেশটির কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে জরুরি সামগ্রীর বিক্রি বেড়েছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম।
বিবিসির ‘নিউজ নাইট’ অনুষ্ঠানের সংগ্রহ করা তথ্য অনুযায়ী, সুপারমার্কেট চেইন আইসল্যান্ডে এক সপ্তাহান্তে টিনজাত খাবারের বিক্রি ৪০ শতাংশ বেড়েছে। বোতলজাত পানির বিক্রিও বেড়েছে।
গৃহস্থালি ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বিক্রেতা রবার্ট ডায়াস জানিয়েছে, আগের সপ্তাহের তুলনায় তাদের রেডিও বিক্রি বেড়েছে ১৬০ শতাংশ। অন্যদিকে ম্যাপলিনের হিসাবে, সরকারি ঘোষণার পর রেডিওর বিক্রি ৯২ শতাংশ, টর্চলাইটের ২৮৪ শতাংশ এবং পাওয়ার ব্যাংকের বিক্রি ১০৬ শতাংশ বেড়েছে।
তবে এসব পরিসংখ্যান নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের। এগুলো দিয়ে গোটা যুক্তরাজ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে বা খাদ্যসংকট তৈরি হয়েছে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। আইসল্যান্ড কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, তাদের প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে।
যুদ্ধ, সাইবার হামলা ও জলবায়ু ঝুঁকি
ইউরোপের প্রস্তুতি বাড়ানোর অন্যতম কারণ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তাগত প্রভাব। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর ইউরোপ বুঝতে পারে, যুদ্ধের প্রভাব শুধু সামরিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। জ্বালানি সরবরাহ, খাদ্যবাজার, পরিবহন ও শিল্প উৎপাদনেও এর প্রভাব পড়ে।
এ ছাড়া আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, ব্যাংকিং ও পরিবহনব্যবস্থার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। কোনো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় সাইবার হামলা বা নাশকতা হলে একাধিক খাতে একসঙ্গে সংকট তৈরি হতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দাবদাহ, দাবানল, বন্যা ও ঝড়ও ইউরোপের জন্য বড় ঝুঁকি। একইভাবে নতুন মহামারি দেখা দিলে হাসপাতাল ও ওষুধ সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে। কোভিড-১৯ মহামারির অভিজ্ঞতাও আগাম প্রস্তুতির গুরুত্ব বাড়িয়েছে।
সুইডেনের সরকারি নির্দেশিকায় সংকটের পাশাপাশি যুদ্ধের পরিস্থিতিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। দেশটির নাগরিকদের এক সপ্তাহ চলার মতো খাবার, পানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে। তবে দেশটিতে নাগরিকদের যুদ্ধকালীন প্রস্তুতির নির্দেশনা নতুন নয়; এর দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।
সামরিক ঘাঁটির জন্য ৯০ দিনের প্রস্তুতি
যুক্তরাষ্ট্রেও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাগুলোর জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
২ নভেম্বর প্রকাশিত দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের ‘ফোর্ট্রেস আমেরিকা’ উদ্যোগের লক্ষ্য হলো, বাইরের সহায়তা না পেলেও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিগুলো যেন অন্তত ৯০ দিন কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে।এ জন্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানির স্বনির্ভরতা, সরবরাহব্যবস্থা, জরুরি মজুত এবং সাইবার নিরাপত্তা শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।তবে এই ৯০ দিনের প্রস্তুতি সাধারণ নাগরিকদের জন্য দেওয়া কোনো নির্দেশনা নয়। এটি সামরিক স্থাপনাগুলোর কার্যক্রম সচল রাখার পরিকল্পনা।
ইউরোপে জ্বালানি উদ্বেগ বাড়ছে
নিরাপত্তা প্রস্তুতির পাশাপাশি সাম্প্রতিক জ্বালানি পরিস্থিতিও ইউরোপের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ২৮ অক্টোবর ২০২৬ ইউরোপের প্রধান প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারদর ডাচ টিটিএফ বেঞ্চমার্কে সাময়িকভাবে প্রতি মেগাওয়াট ঘণ্টায় ১০০ ইউরো ছাড়িয়ে যায়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনে বিঘ্নের আশঙ্কা সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
তবে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি ২০২৫ সালে ঘোষিত ৭২ ঘণ্টার প্রস্তুতি-কৌশলের একমাত্র কারণ নয়। কৌশলটি আরও বিস্তৃত নিরাপত্তা ও দুর্যোগ মোকাবিলার পরিকল্পনা।
বাংলাদেশের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে?
ইউরোপের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপীয় কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের মোট পণ্য বাণিজ্যের ২১ দশমিক ৫ শতাংশের অংশীদার ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন। একই বছরে ইইউর বাংলাদেশ থেকে আমদানির প্রায় ৯৪ শতাংশ ছিল বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতের পণ্য।
তাই ইউরোপের অর্থনীতি ও ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতায় বড় ধরনের পরিবর্তন হলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতেও প্রভাব পড়তে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হলে ইউরোপের ভোক্তারা পোশাক, জুতা ও ফ্যাশনপণ্যের মতো পণ্যে ব্যয় কমাতে পারেন। এতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের ক্রয়াদেশ কমা, পণ্য কেনার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যাওয়া কিংবা কম দামে পণ্য সরবরাহের চাপ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। তবে শুধু ৭২ ঘণ্টার প্রস্তুতির পরামর্শের কারণে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমবে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ভিত্তি নেই।
জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে আমদানি ব্যয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্পের কাঁচামালের দামে চাপ তৈরি হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে পরিবহন ও বিমা ব্যয়ও বাড়তে পারে।
ইউরোপে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিলে সেখানে কর্মরত বাংলাদেশি অভিবাসীদের কর্মসংস্থানেও পরোক্ষ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে ৭২ ঘণ্টার প্রস্তুতি-পরামর্শের কারণে প্রবাসী আয় কমবে এমন কোনো প্রমাণ নেই।
বাংলাদেশের করণীয় কী?
বাংলাদেশের জন্য আতঙ্কিত হওয়ার চেয়ে সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো পর্যবেক্ষণ করা বেশি জরুরি। ইউরোপের বাজারে চাহিদা, আন্তর্জাতিক জ্বালানির দাম, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজারের ওপর নজর রাখতে হবে।
তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে নতুন বাজার খোঁজা, পণ্যে বৈচিত্র্য আনা এবং একক বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি দেশের খাদ্য মজুত, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে ইউরোপের ৭২ ঘণ্টার প্রস্তুতির বার্তা আসন্ন যুদ্ধের ঘোষণা নয়; বরং অনিশ্চিত বিশ্বপরিস্থিতিতে নাগরিক ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ। যুদ্ধ, সাইবার হামলা, মহামারি কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেকোনো সংকটের প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে অন্য দেশেও পৌঁছাতে পারে। বাংলাদেশের জন্যও আগাম প্রস্তুতি ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোই এ পরিস্থিতির বড় শিক্ষা।








