দীর্ঘ অপেক্ষার পর বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য আবারও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলতে যাচ্ছে এটি নিঃসন্দেহে আশার খবর। দেশের হাজারো তরুণ, যারা একটি নিরাপদ কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখছেন, তাদের জন্য মালয়েশিয়া হতে পারে সেই কাঙ্ক্ষিত সুযোগ। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, শ্রমবাজার খোলার আগেই সেই আশার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিভ্রান্তি, অনিশ্চয়তা এবং দালালচক্রের পুরোনো তৎপরতা।

আমাদের প্রশ্ন খুবই সরল যে প্রক্রিয়ায় একজন কর্মী বিদেশে যাবেন, সেটি যদি সরকার স্পষ্টভাবে জানাতে না পারে, তাহলে সাধারণ মানুষ কার ওপর ভরসা করবেন?

মালয়েশিয়া সরকার কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া ও ধাপ প্রকাশ করার পরও বাংলাদেশে সেই তথ্য সহজ ভাষায়, দ্রুত এবং সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছানো হয়নি এ অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তথ্যের শূন্যতা কখনো খালি থাকে না। সেখানে জায়গা করে নেয় দালাল, মধ্যস্বত্বভোগী ও প্রতারকচক্র।

citytouch 728-X-90

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতোমধ্যে মালয়েশিয়ায় চাকরির আশ্বাস দিয়ে নানা ধরনের প্রচারণা শুরু হয়েছে। অথচ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পাসপোর্ট, টাকা বা মেডিকেল পরীক্ষার বিষয়ে কাউকে এগোতে নিষেধ করা হয়েছে।

এই পরিস্থিতি একদিকে সাধারণ কর্মীদের সতর্ক হওয়ার বার্তা দেয়, অন্যদিকে সরকারের কাছেও একটি বড় দায়িত্ব তৈরি করে।

শুধু সতর্কবার্তা দিয়ে দালাল বন্ধ করা যাবে না।

কর্মীরা কোথায় নিবন্ধন করবেন, কোন এজেন্সি বৈধ, কত টাকা খরচ হবে, কার কাছে টাকা দেওয়া যাবে, নিয়োগদাতার চাহিদাপত্র কীভাবে যাচাই হবে প্রতিটি বিষয় সরকারকে প্রকাশ্যে এবং সহজ ভাষায় জানাতে হবে।

৩৩৮টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ২৫টি প্রধান এজেন্সি, ২৫০টি সহযোগী এজেন্সি এবং বোয়েসেলের অধীনে ৬২টি এজেন্সি এই কাঠামো সাধারণ কর্মীর কাছে এখনো যথেষ্ট পরিষ্কার নয়।

বিশেষ করে ‘সহযোগী এজেন্সি’ কীভাবে কাজ করবে এবং তাদের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি হবে কি না এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা জরুরি।

কারণ আমরা অতীত থেকে শিক্ষা নিয়েছি। বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, দালালের দৌরাত্ম্য এবং প্রতারণার অভিযোগ নতুন নয়।

একজন কর্মী অনেক সময় জমি বিক্রি করে, ঋণ নিয়ে কিংবা পরিবারের সঞ্চয় ভেঙে বিদেশ যাওয়ার টাকা জোগাড় করেন। সেই টাকা হারানো মানে শুধু একজন মানুষের ক্ষতি নয়; একটি পুরো পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়া।

এবার সেই চিত্র বদলানোর সুযোগ এসেছে

বিশেষ ব্যবস্থায় আগামী তিন মাসে ১০ হাজার কর্মী মালয়েশিয়ায় পাঠানোর উদ্যোগ এবং বোয়েসেলের মাধ্যমে শূন্য অভিবাসন ব্যয়ে কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনা ইতিবাচক পদক্ষেপ।

বিশেষ করে আগে যেতে না পারা প্রায় ৫ হাজার কর্মীকে সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটতে পারে।

তবে আমাদের প্রত্যাশা এই সুযোগ যেন কোনো দালাল বা সিন্ডিকেটের ব্যবসায় পরিণত না হয়।

সরকার চাইলে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, জেলা কর্মসংস্থান অফিস ও টিটিসির মাধ্যমে একটি সমন্বিত তথ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে। মোবাইল ফোনে নিবন্ধন, এসএমএসের মাধ্যমে আবেদন-অবস্থা জানানো, এজেন্সির বৈধতা যাচাই এবং নির্ধারিত খরচের তালিকা প্রকাশ করা হলে মধ্যস্বত্বভোগীদের সুযোগ অনেকটাই কমে যাবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তথ্যকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

একজন তরুণ যেন বিদেশে যাওয়ার জন্য দালালের দরজায় নয়, প্রথমে সরকারি তথ্যকেন্দ্রে যান এমন ব্যবস্থা তৈরি করাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ নয়; এটি হাজারো পরিবারের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত।

তাই এবার আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত কম খরচে, স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়, নিরাপদে এবং কোনো সিন্ডিকেট ছাড়াই কর্মী পাঠানো।

শ্রমবাজার খুলুক এটাই প্রত্যাশা। কিন্তু তার আগে বিভ্রান্তির দরজা বন্ধ হোক, খুলে দেওয়া হোক স্বচ্ছতার দরজা।


মামুনুর রশিদ খাঁন: সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত), দূরবীন নিউজ।