রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) দুদকের সহকারী পরিচালক তানজির আহমেদ বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
তিনি জানান, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে আগে থেকেই অনুসন্ধান চলছে। এর মধ্যে নতুন করে বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগ এসেছে। কমিশন যাচাই-বাছাই শেষে এসব অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগের অনুসন্ধানের সঙ্গে নতুন অভিযোগগুলোও সংযুক্ত করে তদন্ত করা হবে।
বিদেশে হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ
দুদকে আসা অভিযোগে বলা হয়েছে, ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ আসিফ মাহমুদ তার দুই বোনের জামাই ও এক ভাগ্নের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে পাচার করেছেন। ওই অর্থ বিদেশে বিনিয়োগ করে ব্যবসা ও সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, দুবাইয়ে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচার করে বিলাসবহুল ভিলা কেনা, বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ এবং ‘গ্রীন গ্রুপে’ মূলধন দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে দেড় হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগও আনা হয়েছে। এ ছাড়া পর্তুগালে দুর্নীতির অর্থে জমি কেনার অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের কোনোটিই এখন পর্যন্ত প্রমাণিত হয়নি বলে জানিয়েছে দুদক।
নিয়োগ-পদায়ন ও টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগ
নতুন অভিযোগে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নিয়োগ, বিভিন্ন জেলায় জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদায়ন, সিটি করপোরেশনের টেন্ডার এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা এবং দেশের ৩৬ জন ডিসি পদায়নে ২ থেকে ১০ কোটি টাকা করে লেনদেন হয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যয় বাড়ানোর অভিযোগ
অভিযোগে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে গ্রামীণ অবকাঠামো ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।
কর্মকর্তাদের নিয়োগে ঘুষের অভিযোগ
দুদকে আসা অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আব্দুস সালামকে নিয়োগ দিয়ে ১০ কোটি টাকা উৎকোচ নেওয়া হয়।
এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ খানকে ৫২ কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে নিয়োগ এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনে সিইও হিসেবে আব্দুল লতিফ খানকে ৬৫ কোটি টাকার বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
হেলিকপ্টার ও বিলাসী জীবনযাপনের অভিযোগ
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সরকারি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় আসিফ মাহমুদ হেলিকপ্টারে ভ্রমণ করে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় করেছেন। পাশাপাশি রাজধানীর পাঁচ তারকা হোটেল, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও দামি গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগও করা হয়েছে।
নিজ এলাকায় প্রকল্প বরাদ্দ নিয়েও অভিযোগ
আসিফ মাহমুদের নিজ উপজেলা মুরাদনগরে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দের বিষয়েও অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, তার বাবা বিল্লাল হোসেন ও এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেন ঠিকাদারদের একটি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে স্থানীয় প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তার এবং অর্থ সংগ্রহ করতেন। তার পিও মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধেও ঘুষ লেনদেনে তদবির ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছে।
তবে দুদক জানিয়েছে, এসব অভিযোগ বর্তমানে অনুসন্ধান পর্যায়ে রয়েছে এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো প্রমাণিত হয়নি।
আগের অনুসন্ধান নিয়েও বিতর্ক
এর আগে গত ২ সেপ্টেম্বর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে অনিয়মের অভিযোগে আসিফ মাহমুদসহ চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। অন্য তিনজন হলেন সাবেক সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, সাবেক যুগ্ম সচিব শেখ মোহাম্মদ জোবায়েদ হোসেন এবং উপসচিব মো. মাসুম আহমেদ।
এরপর ৯ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে আসিফ মাহমুদ দুদকের অনুসন্ধানকে ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ এবং রাজনৈতিকভাবে হয়রানির অংশ বলে দাবি করেন।
২০২৪ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন আসিফ মাহমুদ। পরে তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগ করে জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) যোগ দেন এবং দলটির মুখপাত্রের দায়িত্ব নেন।









