কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মডেল নিজেদের অনুলিপি তৈরি করে ইন্টারনেটজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এমনকি নিজেদের বিস্তার বাড়াতে সাইবার হামলা চালানো, বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা প্রতিহত করা এবং ডেটা সেন্টারের কম্পিউটিং সক্ষমতা দখলের চেষ্টাও করতে পারে এসব মডেল। এমন সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছে এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক।

সোমবার (১২ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এআই মডেলগুলোর স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজেদের অনুলিপি তৈরি ও ছড়িয়ে দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি হতে পারে। বিষয়টি সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তবে এ আশঙ্কার বাস্তবতা ও সম্ভাব্যতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দারিও আমোদেই এর আগেও সতর্ক করে বলেছিলেন, আগামী এক বছরের মধ্যে বা তারও আগে এআই পুরো ইন্টারনেটজুড়ে স্থায়ী বটনেট তৈরি করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।

citytouch 728-X-90

বটনেট হলো ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত একাধিক কম্পিউটার বা ডিভাইসের নেটওয়ার্ক, যেগুলো আক্রান্ত হওয়ার পর কোনো ব্যক্তি বা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণে থেকে সমন্বিতভাবে ক্ষতিকর কাজে ব্যবহার করা যায়।

অ্যানথ্রপিকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাদের পরীক্ষায় দেখা গেছে, ৩০ বিলিয়ন বা তার কম প্যারামিটারের মাঝারি আকারের এআই মডেল স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজেদের অনুলিপি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় অনেক কাজ সম্পন্ন করতে পারে। তবে পুরো প্রক্রিয়াটি নির্ভরযোগ্যভাবে শেষ করার ক্ষেত্রে এখনো এসব মডেলের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এআই মডেলগুলো কম খরচের ইন্টারনেট-সংযুক্ত ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং সক্ষমতা সংগ্রহ করতে পারে। একটি সরল পরীক্ষামূলক নেটওয়ার্কে মডেলগুলোকে নিজেদের অনুলিপি ছড়িয়ে দিতেও দেখা গেছে।

অ্যানথ্রপিকের আশঙ্কা, এ ধরনের এআই যদি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিস্তার লাভ করে, তাহলে সেগুলো বন্ধ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। কারণ, ছড়িয়ে পড়া নেটওয়ার্কের জন্য একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা না থাকলে এক জায়গা থেকে পুরো কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব নাও হতে পারে।

এআইয়ের সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাইবার হামলা স্বয়ংক্রিয় করা, মানুষের সীমিত তদারকিতে কার্যক্রম চালানো এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। প্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও গবেষকেরা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া এআইয়ের সম্ভাব্য বিপজ্জনক পরিণতি সম্পর্কেও সতর্ক করে আসছেন।

তবে অ্যানথ্রপিকের আশঙ্কার বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন কয়েকজন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি সেন্টারের সাবেক প্রধান সিয়ারান মার্টিনের মতে, ছোট আকারের কোনো এআই মডেল কম খরচের ডিভাইসে চালানো সম্ভব হওয়া মানেই তা বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকট তৈরি করবে, এমন নয়। তার মতে, প্রতিবেদনটি প্রযুক্তিগতভাবে আগ্রহোদ্দীপক হলেও এতে এআইয়ের সক্ষমতাকে অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপনের প্রবণতা থাকতে পারে।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো ডেনভারের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ঝেংশিয়ং লি বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পরীক্ষার ফলাফলও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এআই যদি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছড়িয়ে পড়া কম্পিউটার ভাইরাসের মতো আচরণ করে এবং বিভিন্ন ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার উপায় খুঁজে পায়, তাহলে তা গুরুতর নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

লি বলেন, কোনো এআই যদি একটি কেন্দ্রীয় সেবার ওপর নির্ভর না করে অসংখ্য ডিভাইসে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে সেটিকে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার জন্য নির্দিষ্ট কোনো কেন্দ্র নাও থাকতে পারে।

অ্যানথ্রপিকের ধারণা, ছোট আকারের এআই মডেলগুলোর সক্ষমতা বর্তমান গতিতে বাড়তে থাকলে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজেদের অনুলিপি ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারে। এ ছাড়া আরও শক্তিশালী কম্পিউটিং সক্ষমতা পেতে ডেটা সেন্টারের প্রসেসর লক্ষ্যবস্তু করার উপায়ও মডেলগুলো খুঁজে বের করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড ইমার্জিং টেকনোলজির জ্যেষ্ঠ গবেষণা বিশ্লেষক জেসিকা জি মনে করেন, অ্যানথ্রপিকের বক্তব্যকে নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে না দেখে সম্ভাব্য ঝুঁকির একটি চিত্র হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

তার মতে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এআইয়ের নিয়ন্ত্রণহীন কার্যক্রম নিয়ে যেসব তথ্য সামনে এসেছে, তাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা যুক্তিসংগত। তবে বাস্তবে এমন ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা কতটা, তা এখনো নিশ্চিত নয়। সম্ভাবনাটি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না, আবার এমন ঘটনা ঘটবেই—এমন নিশ্চয়তাও নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এআইয়ের সক্ষমতা যত বাড়বে, ততই এর নিরাপদ ব্যবহার, কার্যক্রমের ওপর নজরদারি এবং সম্ভাব্য অপব্যবহার ঠেকানোর ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন হবে। তবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইন্টারনেটজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এআই বাস্তবে কতটা সম্ভাব্য, তা নির্ধারণে আরও গবেষণা ও পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।