গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে জাপানের এক সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করেছে রাশিয়া। তাঁর বিরুদ্ধে জাপানের জন্য রুশ প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ এনেছে মস্কো। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, হোক্কাইডো শিমবুনের সাংবাদিক ইউকি ইমাইকে রাশিয়ার সুদূর পূর্বাঞ্চলীয় সাখালিন এলাকা থেকে আটক করা হয়েছে। আটকের এক দিন পর তাঁর রাশিয়া ছাড়ার কথা ছিল।

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইমাই জাপানের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার নির্দেশে কাজ করছিলেন বলে অভিযোগ করেছে রুশ কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া কুরিল দ্বীপপুঞ্জে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের অভিযোগও আনা হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

citytouch 728-X-90

রাশিয়ার আরেক সংবাদ সংস্থা ইন্টারফ্যাক্স জানিয়েছে, ইমাইকে মস্কোয় নেওয়া হয়েছে। বিচার শুরুর আগে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত তাঁকে হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাশিয়ায় গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হলে তাঁর সর্বোচ্চ ২০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।

এ ঘটনায় জাপান সরকার বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করেনি। তবে মঙ্গলবার দেশটির প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি জানিয়েছেন, কর্তৃপক্ষ ঘটনার সত্যতা যাচাই করছে। যাচাই শেষে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা এক বিবৃতিতে অভিযোগ করেন, বিদেশি সাংবাদিকের পরিচয় ব্যবহার করে রাশিয়ার নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে টোকিও। তিনি এ ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বলেও মন্তব্য করেন। তবে একই ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে অন্য কোনো সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যমের নাম উল্লেখ করেননি তিনি।

ইমাইয়ের প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর মধ্যে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক এবং সাখালিন অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে লেখা রয়েছে। তাঁর গ্রেপ্তারের বিষয়ে তাঁর কর্মস্থল একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করলেও সেখানে সাংবাদিকের নাম উল্লেখ করা হয়নি। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটি আর কোনো মন্তব্য করেনি।

রাশিয়া ও জাপানের মধ্যে দীর্ঘদিনের ভূখণ্ডগত বিরোধ রয়েছে কুরিল দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে দ্বীপপুঞ্জের দক্ষিণের চারটি দ্বীপের মালিকানা দাবি করে আসছে জাপান। অন্যদিকে, দ্বীপগুলো রাশিয়ার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। জাপান এগুলোকে ‘উত্তরাঞ্চলীয় অঞ্চল’ নামে অভিহিত করে।

গত আগস্টে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বিতর্কিত দ্বীপপুঞ্জটি সফর করার পর দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। এটি ছিল ওই অঞ্চলে পুতিনের প্রথম সফর। সফরটির সমালোচনা করে তাকাইচি বলেছিলেন, এটি জাপানের জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করেছে এবং দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে টোকিওর দীর্ঘদিনের অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তবে মস্কো তাঁর বক্তব্যকে রাজনৈতিকভাবে অনুপযুক্ত ও আইনগতভাবে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করে।

দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা চললেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পর মস্কোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে জাপান। এতে দুই দেশের সম্পর্ক আরও শীতল হয়ে পড়ে।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) জাপানি প্রেসিডেন্ট তোমোকো আকানেকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে রাশিয়ার অবস্থান নিয়েও টোকিওর অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। ইউক্রেনে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে পুতিনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল আইসিসি। এর পর ২০২৩ সাল থেকে আকানে ও আদালতের কয়েকজন কর্মকর্তাকে রাশিয়ার ওয়ান্টেড তালিকায় রাখা হয়েছে।

রাশিয়ায় বিদেশি সাংবাদিক আটকের ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। ২০২৩ সালে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক ইভান গার্শকোভিচকে আটক করা হয়। পরে তাঁকে ১৬ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালে বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় তিনি মুক্তি পান। স্নায়ুযুদ্ধের পর এটি ছিল অন্যতম বড় বন্দিবিনিময়।

এর আগে ২০১৯ সালেও সামরিক গোপন তথ্য সংগ্রহের সন্দেহে জাপানের কিয়োদো নিউজের এক সাংবাদিককে আটক করেছিল রাশিয়া। ভ্লাদিভস্তক থেকে আটক ওই সাংবাদিককে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

ইউকি ইমাইয়ের গ্রেপ্তারের ঘটনা তাই রাশিয়া-জাপান সম্পর্কের পুরোনো বিরোধের মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টির আশঙ্কা বাড়িয়েছে।