না, বিজ্ঞানীদের নজরে নতুন যেসব গ্রহ

পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্বের সন্ধান দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের অন্যতম আগ্রহের বিষয়। এখন পর্যন্ত পৃথিবীই প্রাণের অস্তিত্ব নিশ্চিত হওয়া একমাত্র গ্রহ। তবে গবেষকদের ধারণা, মহাবিশ্বে এমন কিছু গ্রহ থাকতে পারে, যেগুলো প্রাণের উদ্ভব ও বিকাশের জন্য পৃথিবীর চেয়েও বেশি উপযোগী।

‘সুপারহ্যাবিটেবল ওয়ার্ল্ডস’ বা অতিমাত্রায় বাসযোগ্য গ্রহ হিসেবে পরিচিত এসব জগতে উষ্ণ ও স্থিতিশীল জলবায়ু, পর্যাপ্ত পানি এবং প্রাণের বিবর্তনের জন্য দীর্ঘ সময় পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এসব গ্রহে পৃথিবীর তুলনায় কয়েক শ কোটি বছর বেশি সময় ধরে প্রাণের অস্তিত্ব টিকে থাকা ও বিকশিত হওয়ার অনুকূল পরিবেশ থাকতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব নিশ্চিত করা যায়নি।

citytouch 728-X-90

সুপারহ্যাবিটেবল গ্রহ কী?

সুপারহ্যাবিটেবল গ্রহ বলতে এমন গ্রহকে বোঝায়, যেখানে প্রাণের উদ্ভব, বিকাশ ও টিকে থাকার পরিবেশ পৃথিবীর তুলনায় আরও অনুকূল হতে পারে। গবেষকদের ধারণা, এ ধরনের গ্রহ পৃথিবীর চেয়ে প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি প্রশস্ত হতে পারে এবং এর ভর হতে পারে পৃথিবীর প্রায় দ্বিগুণ।

বেশি ভরের কারণে এসব গ্রহ শক্তিশালী অভিকর্ষের মাধ্যমে ঘন বায়ুমণ্ডল ধরে রাখতে পারে। এতে জলবায়ু তুলনামূলক উষ্ণ ও স্থিতিশীল থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়। বড় লৌহকেন্দ্রের কারণে শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র গড়ে উঠতে পারে, যা মহাকাশের ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে প্রাণকে সুরক্ষা দিতে সহায়তা করতে পারে।

এ ছাড়া এসব গ্রহে বিস্তৃত অগভীর সমুদ্র, হ্রদ ও দ্বীপ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। পৃথিবীর গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দ্বীপ ও অগভীর জলরাশিতে যেমন সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য দেখা যায়, তেমনি পরিবেশ কোনো গ্রহের বড় অংশজুড়ে বিস্তৃত থাকলে সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণের বিকাশের সুযোগ বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।

কমলা রঙের নক্ষত্র কেন গুরুত্বপূর্ণ?

সুপারহ্যাবিটেবল গ্রহের অনুসন্ধানে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে ‘কে-ডোয়ার্ফ’ নামে পরিচিত এক ধরনের নক্ষত্র। এগুলো সূর্যের তুলনায় ছোট, শীতল এবং কমলা রঙের। এসব নক্ষত্র নিজেদের জ্বালানি ধীরে ধীরে ব্যবহার করে। ফলে সূর্যের তুলনায় অনেক দীর্ঘ সময় ধরে স্থিতিশীলভাবে আলো ও শক্তি সরবরাহ করতে পারে।

এ ধরনের নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকা গ্রহে প্রাণের উদ্ভব ও বিবর্তনের জন্য দীর্ঘ সময় পাওয়া সম্ভব। এতে জটিল জীবনের বিকাশের সম্ভাবনাও বাড়তে পারে।

জার্মানির বার্লিনের একটি গবেষণাগারে জ্যোতির্জীববিজ্ঞানী ইভা ভিলোভিচ কে-ডোয়ার্ফ নক্ষত্রের আলোর অনুকরণে কৃত্রিম আলো তৈরি করে উদ্ভিদের ওপর পরীক্ষা চালান। তিনি ওই কমলা রঙের আলো ব্যবহার করে বাগানে শাক চাষ করেন। পরীক্ষায় দেখা যায়, কৃত্রিম সূর্যালোকের তুলনায় কমলা আলোয় উদ্ভিদ দ্রুত বেড়েছে এবং বেশি লম্বা হয়েছে।

এই পরীক্ষা থেকে ধারণা পাওয়া যায়, কে-ডোয়ার্ফ নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকা গ্রহেও সালোকসংশ্লেষণ কার্যকরভাবে ঘটতে পারে। সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে উদ্ভিদ আলো ব্যবহার করে নিজের খাদ্য তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি সংগ্রহ করে।

বর্তমানে জার্মানির লাইবনিজ ইনস্টিটিউট ফর অ্যাস্ট্রোফিজিকসে কর্মরত ভিলোভিচের মতে, ভিনগ্রহে প্রাণের সন্ধান করতে গিয়ে এসব নক্ষত্রের আলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

পৃথিবীই কি প্রাণের জন্য সবচেয়ে উপযোগী গ্রহ?

পৃথিবীর চেয়েও বেশি বাসযোগ্য গ্রহ থাকার ধারণাটি ২০১০-এর দশকে বিজ্ঞানীদের মধ্যে আলোচনায় আসে। জ্যোতির্বিজ্ঞানী রেনে হেলার ও জন আর্মস্ট্রং এ বিষয়ে গবেষণা করেন। তাঁদের মতে, প্রাণের জন্য সবচেয়ে উপযোগী পরিবেশের একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে পৃথিবীকে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।

২০১৪ সালে তাঁরা সুপারহ্যাবিটেবল গ্রহ নিয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। এতে পৃথিবীর মতো দেখতে গ্রহ খোঁজার পাশাপাশি প্রাণের জন্য আরও অনুকূল পরিবেশ থাকতে পারে, এমন গ্রহ অনুসন্ধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব টিকে থাকা বেশ কিছু সূক্ষ্ম প্রাকৃতিক ভারসাম্যের ওপর নির্ভরশীল। বিজ্ঞানীদের ধারণা, পৃথিবী সূর্যের সামান্য কাছাকাছি থাকলেও এর পরিবেশ ও সমুদ্রের বর্তমান অবস্থা ভিন্ন হতে পারত। এ ছাড়া সূর্যের ক্রমবর্ধমান উজ্জ্বলতা দীর্ঘমেয়াদে পৃথিবীর জন্য হুমকি তৈরি করছে।

গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৫০ কোটি বছর পর পৃথিবী উদ্ভিদ ও প্রাণীসহ জটিল জীবনের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে, কে-ডোয়ার্ফ নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকা কিছু গ্রহ দীর্ঘ সময় ধরে প্রাণের উপযোগী পরিবেশ ধরে রাখতে পারে। কারণ, এসব নক্ষত্রের বিবর্তন সূর্যের তুলনায় ধীরগতিতে ঘটে।

তবে কোনো গ্রহ দীর্ঘ সময় বাসযোগ্য থাকলেই সেখানে প্রাণের উদ্ভব ঘটবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। প্রাণের উৎপত্তি ও বিবর্তনের জন্য আরও নানা শর্ত প্রয়োজন।

এসব গ্রহে কি ভিনগ্রহের প্রাণী থাকতে পারে?

সুপারহ্যাবিটেবল গ্রহে উদ্ভিদ ও প্রাণীসহ সমৃদ্ধ বাস্তুতন্ত্র গড়ে উঠতে পারে বলে ধারণা করছেন গবেষকেরা। কিছু সম্ভাব্য গ্রহে অগভীর সমুদ্র, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দ্বীপ এবং বৈচিত্র্যময় সামুদ্রিক পরিবেশ থাকার কথা কল্পনা করা হচ্ছে।

তবে পৃথিবীর বাইরে এমন কোনো বাস্তুতন্ত্র বা ভিনগ্রহের প্রাণের অস্তিত্বের প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। কোনো গ্রহে উপযুক্ত তাপমাত্রা, তরল পানি ও অনুকূল বায়ুমণ্ডল থাকলেই সেখানে প্রাণ রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

এ কারণে বিজ্ঞানীরা এমন গ্রহ শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন, যেখানে তাপমাত্রা ও পানির পাশাপাশি প্রাণের অস্তিত্বের সম্ভাব্য ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে। গ্রহের বায়ুমণ্ডলে নির্দিষ্ট কিছু গ্যাসের উপস্থিতিও বিশ্লেষণ করা হবে, কারণ সেগুলো কোনো কোনো ক্ষেত্রে জৈবিক কার্যকলাপের ইঙ্গিত দিতে পারে।

কীভাবে সন্ধান মিলবে এসব গ্রহের?

সম্ভাব্য বাসযোগ্য গ্রহ শনাক্ত করতে উন্নত মহাকাশ দূরবীক্ষণযন্ত্র ব্যবহারের পরিকল্পনা করছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার ‘প্ল্যাটো’ (প্ল্যানেটারি ট্রানজিটস অ্যান্ড অসিলেশনস অব স্টারস) অভিযান ২০২৭ সালে উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে। এই অভিযানের মাধ্যমে প্রাণের জন্য উপযোগী হতে পারে, এমন গ্রহ শনাক্ত করার আশা করা হচ্ছে। এর মধ্যে কে-ডোয়ার্ফ নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকা বড় আকারের পাথুরে গ্রহও থাকতে পারে।

এ অভিযানের সঙ্গে যুক্ত জ্যোতির্বিজ্ঞানী রেনে হেলারের ধারণা, এর মাধ্যমে প্রাণের সম্ভাবনা রয়েছে, এমন একাধিক গ্রহের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে। তবে গ্রহ শনাক্ত করা হবে অনুসন্ধানের প্রথম ধাপ। এরপর সেসব গ্রহের বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণ করে প্রাণের সম্ভাব্য চিহ্ন খুঁজতে হবে।

এ ক্ষেত্রে জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণযন্ত্র কিছু গ্রহের বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণে সহায়তা করতে পারে। পাশাপাশি চিলিতে নির্মাণাধীন এক্সট্রিমলি লার্জ টেলিস্কোপ আরও বিস্তারিত পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি করবে।

এ ছাড়া ২০৪০-এর দশকে উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে নাসার ‘হ্যাবিটেবল ওয়ার্ল্ডস অবজারভেটরি’র। দূরবর্তী গ্রহে প্রাণের অস্তিত্বের সম্ভাব্য লক্ষণ অনুসন্ধানে এই পর্যবেক্ষণযন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

মহাবিশ্বে প্রাণের অস্তিত্ব কি ধারণার চেয়েও বেশি?

সুপারহ্যাবিটেবল গ্রহ নিয়ে গবেষণা মহাবিশ্বে প্রাণের বিস্তার সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন সামনে এনেছে। কিছু গ্রহে স্থিতিশীল জলবায়ু, পর্যাপ্ত পানি এবং বিবর্তনের জন্য দীর্ঘ সময় থাকলে সেখানে জটিল প্রাণের বিকাশের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

তবে এসব সম্ভাবনা এখনো বৈজ্ঞানিক অনুমানের পর্যায়ে রয়েছে। পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্ব নিশ্চিত করার মতো কোনো প্রমাণ বিজ্ঞানীদের হাতে নেই।

ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযান ও উন্নত দূরবীক্ষণযন্ত্রের পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সুপারহ্যাবিটেবল গ্রহের সন্ধান মিলতে পারে। সেসব গ্রহের পরিবেশ ও বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা হয়তো একদিন জানতে পারবেন, পৃথিবীই কি প্রাণের একমাত্র আবাস, নাকি মহাবিশ্বে আরও কোনো জগৎ রয়েছে, যেখানে প্রাণের বিকাশের সুযোগ পৃথিবীর চেয়েও বেশি।