দীর্ঘ ভ্রমণ কিংবা বিদ্যুৎ না থাকার সময় মুঠোফোন সচল রাখতে পাওয়ার ব্যাংক এখন অনেকের নিত্যসঙ্গী। তবে এই ছোট ডিভাইস থেকেও ঘটতে পারে বড় দুর্ঘটনা। বিভিন্ন স্থানে পাওয়ার ব্যাংকে আগুন লাগার ঘটনা এর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

সাধারণত ভালো মানের পাওয়ার ব্যাংক নিরাপদ হলেও শারীরিক ক্ষতি, অতিরিক্ত তাপ, নিম্নমানের যন্ত্রাংশ কিংবা ভুলভাবে ব্যবহার ও সংরক্ষণের কারণে এতে আগুন লাগতে পারে। বিশেষ করে লিথিয়াম ব্যাটারিতে ত্রুটি দেখা দিলে পরিস্থিতি দ্রুত বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

পাওয়ার ব্যাংকের প্রধান অংশগুলোর মধ্যে রয়েছে রিচার্জেবল লিথিয়াম-আয়ন বা লিথিয়াম-পলিমার ব্যাটারি, সার্কিট বোর্ড এবং ইনপুট ও আউটপুট পোর্ট। অতিরিক্ত তাপ, বৈদ্যুতিক ত্রুটি কিংবা শারীরিক আঘাতের কারণে এসব অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তৈরি হয়।

citytouch 728-X-90

কেন আগুন ধরে পাওয়ার ব্যাংকে?

পাওয়ার ব্যাংকে আগুন লাগার অন্যতম কারণ হলো ব্যাটারির অভ্যন্তরীণ শর্টসার্কিট, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাটারি সেল এবং উৎপাদনগত ত্রুটি। এসব কারণে ব্যাটারির ভেতরে অতিরিক্ত তাপ তৈরি হতে পারে।

ব্যাটারির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ‘থার্মাল রানওয়ে’ নামের একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এ অবস্থায় ব্যাটারির ভেতরে তাপ উৎপাদনকারী রাসায়নিক বিক্রিয়া দ্রুত বাড়তে থাকে। ফলে তাপমাত্রা ক্রমাগত বেড়ে আগুন লাগা, ধোঁয়া নির্গত হওয়া কিংবা বিস্ফোরণের মতো ঘটনা ঘটতে পারে।

এ ছাড়া নিম্নমানের পাওয়ার ব্যাংক ব্যবহার, অনুপযুক্ত চার্জার দিয়ে চার্জ দেওয়া, ব্যাটারিতে আঘাত লাগা এবং অতিরিক্ত গরম পরিবেশে সংরক্ষণ করাও ঝুঁকি বাড়ায়। দীর্ঘ সময় ধরে অনুপযুক্তভাবে চার্জে রাখা কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত পাওয়ার ব্যাংক ব্যবহার চালিয়ে যাওয়াও বিপজ্জনক হতে পারে।

বিমান ও গণপরিবহনেও ঘটেছে দুর্ঘটনা

লিথিয়াম ব্যাটারির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের অন্যতম কারণ হলো পরিবহন খাতে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফএএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত লিথিয়াম ব্যাটারিসংক্রান্ত ৭৬৬টি বিমান চলাচলের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

স্কুট, এয়ার বুসান ও বাটিক এয়ারের ফ্লাইটে পোর্টেবল চার্জার থেকে আগুন লাগার ঘটনাও ঘটেছে। এ ছাড়া সিঙ্গাপুরের এমআরটি ট্রেনেও পাওয়ার ব্যাংকে আগুন লাগার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

এসব ঘটনা থেকে বোঝা যায়, আকারে ছোট হলেও পাওয়ার ব্যাংকের ব্যাটারিতে ত্রুটি দেখা দিলে তা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি আশপাশের মানুষের জন্যও বিপদের কারণ হতে পারে।

পাওয়ার ব্যাংক নিরাপদ রাখতে যা করবেন

পাওয়ার ব্যাংকের অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমাতে কয়েকটি সতর্কতা মেনে চলা জরুরি।

প্রথমত, বিশ্বস্ত ও পরিচিত ব্র্যান্ডের মানসম্মত পাওয়ার ব্যাংক ব্যবহার করতে হবে। কেনার সময় পণ্যের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্য, নির্মাণমান ও ওয়ারেন্টি যাচাই করা ভালো।

চার্জ দেওয়ার সময় পাওয়ার ব্যাংক অতিরিক্ত গরম হচ্ছে কি না, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। নির্মাতার নির্দেশনা অনুযায়ী চার্জ দিতে হবে এবং বিছানা, বালিশ বা অন্য কোনো দাহ্য বস্তুর ওপর রেখে চার্জ দেওয়া এড়িয়ে চলতে হবে। সারারাত বা দীর্ঘ সময় ধরে চার্জে রাখার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

পাওয়ার ব্যাংক ঠান্ডা ও শুষ্ক স্থানে রাখতে হবে। সরাসরি সূর্যের আলো, গরম গাড়ির ভেতর, পানি এবং অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখা জরুরি।

চাবি, ধাতব মুদ্রা কিংবা অন্য কোনো পরিবাহী বস্তুর সঙ্গে পাওয়ার ব্যাংক একই জায়গায় রাখলে এর পোর্টে শর্টসার্কিটের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই এসব বস্তু থেকে আলাদা করে সংরক্ষণ করা উচিত।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পাওয়ার ব্যাংক ফুলে গেলে, ফেটে গেলে, অস্বাভাবিক গরম হলে কিংবা পড়ে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটি ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। এমন অবস্থায় পুনরায় চার্জ দেওয়া বা নিজে থেকে খুলে মেরামতের চেষ্টা করা উচিত নয়। নিরাপদভাবে ব্যবহার বন্ধ করে স্থানীয় ই-বর্জ্য বা ব্যাটারি সংগ্রহের উপযুক্ত ব্যবস্থার মাধ্যমে এটি নিষ্পত্তি করতে হবে।

পাওয়ার ব্যাংক ব্যবহারে সামান্য অসতর্কতাও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তাই মানসম্মত পণ্য বেছে নেওয়া, সঠিকভাবে চার্জ দেওয়া এবং ব্যাটারির অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়াই নিরাপদ থাকার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।