ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য তৃতীয় দফার যুদ্ধে ভিন্ন কৌশল নিতে চায় ইসরাইল। দেশটির কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা মনে করছেন, ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইলের কিছু বিশেষ সামরিক ও কৌশলগত সুবিধা রয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি অংশগ্রহণে এবারের সংঘাত আগের মতো দীর্ঘস্থায়ী না হয়ে দ্রুত চূড়ান্ত পরিণতির দিকে যেতে পারে। তবে এই আশাবাদের বিপরীতে বড় ধরনের ঝুঁকিও দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

ইসরাইলের নিরাপত্তা ও সামরিক পরিস্থিতি নিয়ে এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, অনেক ইসরাইলি মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের তৃতীয় দফার যুদ্ধ সামনে আসতে পারে। তবে এই যুদ্ধই শেষ লড়াই হবে, নাকি আগের মতো সংঘাতের আরেকটি পর্ব মাত্র—তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

ইসরাইলের অভিজ্ঞতায় দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের অন্যতম উদাহরণ গাজা। ২০০৮-০৯, ২০১২, ২০১৪ ও ২০২১ সালে হামাসের সঙ্গে বড় ধরনের সংঘাত হয়েছে। এর বাইরে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের আগেও একাধিক ছোটখাটো সংঘর্ষে জড়িয়েছে দুই পক্ষ। ফলে ইরানও ইসরাইলের জন্য একই ধরনের দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা সমস্যায় পরিণত হতে পারে কি না, সেই প্রশ্ন উঠছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে পুরোপুরি পরাজিত করা কঠিন হলে দেশটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, হামলা থেকে বিরত রাখা এবং সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর গতি কমিয়ে দেওয়াই ইসরাইলের প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হামলা ইসরাইলের বিভিন্ন শহরের জন্য নিয়মিত হুমকি হয়ে উঠতে পারে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, বিদেশি বিনিয়োগ, বিমান চলাচল এবং দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে বিপুল অর্থ ব্যয়ে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন করতে হবে।

ইসরাইল সামরিকভাবে এগিয়ে থাকলেও ইরান নতুন কোনো অস্ত্র বা কৌশল ব্যবহার করে পরিস্থিতি পাল্টে দিতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।

বিশ্লেষণে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা থেকে তাৎক্ষণিক বড় কোনো হুমকি না থাকলে এখনই কেন নতুন করে যুদ্ধে জড়াতে চাইবে ইসরাইল? এসব কর্মসূচি ভবিষ্যতে আবারও হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তবে আগামী কয়েক বছরে সেগুলো বড় বা তাৎক্ষণিক বিপদ হয়ে দাঁড়ানোর আশঙ্কা তুলনামূলক কম বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ইরানের বিরুদ্ধে এবারের সংঘাত আগের তুলনায় দ্রুত ও কার্যকর হতে পারে বলে মনে করছেন ইসরাইলের কয়েকজন কর্মকর্তা। তাদের আশাবাদের পেছনে দুটি প্রধান কারণ রয়েছে।

প্রথমত, ইরানে ক্ষমতাসীন শাসনব্যবস্থার বিরোধী মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। দেশটির কয়েক কোটি মানুষ সরকারের প্রতি অসন্তুষ্ট এবং শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন চান বলে ইসরাইলি কর্মকর্তাদের ধারণা। তাদের মতে, এই অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ইরানের সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, ইসরাইলের পাশে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক শক্তি যুক্তরাষ্ট্র। দুই দেশের সামরিক বাহিনী একসঙ্গে অভিযান চালালে ইরানের ওপর চাপ বহুগুণ বাড়বে। পুরো সময়জুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি প্রদর্শন ও অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখার বিষয়টিও ইসরাইলের কৌশলগত সুবিধা হিসেবে দেখছেন দেশটির কর্মকর্তারা।

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ও জনঅসন্তোষকে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে দেশটির শাসনব্যবস্থা বড় সংকটে পড়তে পারে।

তবে ইরানের শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করা হামাসকে মোকাবিলার চেয়ে অনেক কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে বড় ধরনের স্থল অভিযান রাজনৈতিকভাবে অসম্ভব অথবা সামরিকভাবে অত্যন্ত জটিল বলে মনে করা হচ্ছে।

ইসরাইলের কয়েকজন কর্মকর্তার ধারণা, নতুন দফার হামলা ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে তেহরান পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ছাড় দিতে পারে। এমনকি একপর্যায়ে দেশটির শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তনও আসতে পারে।

তবে এই সম্ভাবনা নিয়ে নিশ্চিত নন বিশ্লেষকেরা। এর আগে ৪০ দিনে ইরানের ওপর ৩০ হাজারের বেশি বোমা নিক্ষেপ করেও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো ছাড় আদায় করা যায়নি। শাসনব্যবস্থারও পতন ঘটেনি। ফলে নতুন করে হামলা চালালেই দ্রুত বিজয় আসবে—এমন ধারণাকে বাস্তবসম্মত মনে করছেন না তারা।

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইসরাইলের এই কৌশল সফলও হতে পারে, আবার ব্যর্থও হতে পারে। তবে যুদ্ধের সম্ভাব্য সাফল্যের পাশাপাশি ইসরাইলের সাধারণ মানুষ ও দেশটির অর্থনীতিকে এর জন্য কতটা মূল্য দিতে হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার বিষয়।