ফেসবুকে পরিচয়ের সূত্র ধরে রাজধানীর পোস্তগোলা এলাকা থেকে এক সাংবাদিককে ডেকে নিয়ে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে অজ্ঞাত স্থানে আটকে রাখা এবং তার ব্যাংক হিসাব ও মোবাইল আর্থিক সেবা থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগী সাংবাদিকের নাম কামরুজ্জামান বাবলু। তিনি মঙ্গলবার ঢাকার সিএমএম আদালতে এ ঘটনায় অপহরণের মামলা করেছেন।
মামলার অভিযোগ ও ভুক্তভোগীর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রায় দুই মাস আগে ফেসবুকের মেসেঞ্জারে ‘মামুন শেখ’ নামে একটি আইডির সঙ্গে কামরুজ্জামান বাবলুর পরিচয় হয়। প্রথমে সাধারণ কথাবার্তা হলেও পরে ওই ব্যক্তি নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের উৎস হিসেবে পরিচয় দেন। সাংবাদিক পরিচয় জানার পর তিনি বিটকয়েনসহ বিভিন্ন বিষয়ে ‘চাঞ্চল্যকর তথ্য’ দেওয়ার কথা বলেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকায় আসার কথা জানিয়ে মামুন শেখ সাংবাদিক বাবলুকে দেখা করার প্রস্তাব দেন। বাবলু তাকে অফিসে আসতে বললেও মামুন জানান, তিনি জুরাইনে আত্মীয়ের বাসায় রয়েছেন। পরে সেখানে গিয়ে দেখা করার অনুরোধ করলে বাবলু জুরাইনে যান।
দুপুর আড়াইটার দিকে পোস্তগোলা ব্রিজসংলগ্ন একটি মার্কেটের সামনে তাদের দেখা হয়। এ সময় মামুন তার বন্ধু ‘অনিক’ নামে একজনের সঙ্গে বাবলুকে পরিচয় করিয়ে দেন। পরে নিরিবিলি পরিবেশে কথা বলার কথা বলে তাকে একটি মাইক্রোবাসের কাছে নেওয়া হয়। প্রথমে গাড়িতে উঠতে অনাগ্রহ প্রকাশ করলেও পীড়াপীড়ির কারণে তিনি গাড়িতে ওঠেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাবলুর ভাষ্য অনুযায়ী, গাড়ির ভেতরে আগে থেকেই আরও তিনজন ছিলেন। তিনি গাড়িতে ওঠার পর অস্ত্রের মুখে তাকে চুপ থাকতে বলা হয়। পরে তার হাত ও চোখ বেঁধে ফেলা হয়। হত্যার হুমকি দিয়ে গাড়িটি অজ্ঞাত স্থানের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা গাড়িতে রাখার পর তাকে একটি গভীর জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অস্ত্রধারী কয়েকজন ব্যক্তি তাকে ঘিরে রাখেন এবং বিভিন্ন ধরনের হুমকি ও গালিগালাজ করেন।
বাবলুর অভিযোগ, অপহরণকারীরা তাকে সরকারের বিরুদ্ধে এবং শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ফেসবুকে লেখালেখি করার বিষয়ে প্রশ্ন করেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন তথ্য চাওয়ার বিষয়েও তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। একপর্যায়ে তাকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার কথা উল্লেখ করে ভয় দেখানো হয় এবং হত্যার পর তার মরদেহের মাংস মাছকে খাওয়ানোর হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
এ সময় তার মোবাইল ফোন, ব্যাংক কার্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র নিয়ে নেওয়া হয়। বাইরের কারও সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগও বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, রাত ৯টার দিকে বাবলুর স্ত্রী ফোন করলে অপহরণকারীরা তাকে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে বাধ্য করে। তবে কথোপকথনের সময় তার স্ত্রী পরিস্থিতি আঁচ করতে পারেন। পরে তিনি বিষয়টি বাবলুর বড় ভাইদের জানান। স্বজনরা থানায় গিয়ে বিষয়টি অবহিত করেন।
বাবলুর ভাষ্য অনুযায়ী, রাত সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার দিকে পুলিশ তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও অপহরণকারীরা তাকে ফোন ধরতে দেয়নি। পরে রাত আড়াইটার দিকে তাদের উপস্থিতিতেই তিনি স্ত্রীর সঙ্গে এবং পুলিশের এক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেন।
এ ঘটনায় নিজের ব্যাংক হিসাবের বিবরণী, মোবাইল আর্থিক সেবার লেনদেনের তথ্য, টাকা উত্তোলনের তথ্য, ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর এবং মোবাইল ফোনের আইএমইআই নম্বরসহ বিভিন্ন তথ্য আদালতে দাখিল করেছেন বলে জানিয়েছেন বাবলু।
সাংবাদিক বাবলু বলেন, ফেসবুকে পরিচয়ের পর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেওয়ার কথা বলে তাকে ডেকে নেওয়া হয়েছিল। পরে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে চোখ ও হাত বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় এবং তার ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে টাকা নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত সুযোগ পেয়ে তিনি পালিয়ে জীবন রক্ষা করেন বলে দাবি করেন।
এ বিষয়ে পল্টন থানার এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, অপহরণ, জিম্মি করে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ নিয়ে সাংবাদিক বাবলু থানায় এসেছিলেন। তাকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার নিন্দা জানিয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে। তারা বলেছে, একজন সাংবাদিককে পরিকল্পিতভাবে ফাঁদে ফেলে অপহরণ, অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে হত্যার হুমকি দেওয়া এবং অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। এ ধরনের ঘটনা সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনভাবে পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক।
সংশ্লিষ্টরা ব্যাংকিং লেনদেন, এটিএম বুথের সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল আর্থিক সেবা হিসাব, সংশ্লিষ্ট মোবাইল নম্বর ও আইএমইআই নম্বরসহ প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্ত এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।










