অনলাইনে খাবার অর্ডার ও পৌঁছে দেওয়ার সেবা দিয়ে জনপ্রিয়তা পাওয়া প্ল্যাটফর্ম ফুডপান্ডাকে ঘিরে অসন্তোষ দিন দিন তীব্র হচ্ছে। একদিকে রাইডার, রেস্তোরাঁ মালিক ও গ্রাহকদের বহুমুখী অভিযোগ, অন্যদিকে শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের মামলা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। 

ফুডপান্ডার ডেলিভারি কার্যক্রম পরিচালনায় যুক্ত রাইডারদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করেও প্রত্যাশিত আয় হচ্ছে না। অর্জিত পারিশ্রমিক থেকে মোটরসাইকেল বা বাইসাইকেল রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি ও মোবাইল ডেটার খরচ বাদ দেওয়ার পর দিনশেষে হাতে খুব সামান্য টাকাই থাকে। 

এছাড়া দূরত্বের তুলনায় কম ডেলিভারি চার্জ এবং ইনসেনটিভ পাওয়ার কঠিন শর্ত নিয়ে রাইডারদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এর পাশাপাশি, যানজট বা রেস্তোরাঁয় খাবার তৈরিতে দেরি হলেও সেই দায় রাইডারদের ওপর চাপিয়ে একতরফা পেনাল্টি ও অ্যাকাউন্ট স্থগিত (সাসপেনশন) করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

citytouch 728-X-90

রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকার রাইডার সাইফুল ইসলাম বলেন, সারাদিন রাস্তায় ঘুরে অর্ডার ডেলিভারি করতে হয়। কিন্তু আয় থেকে জ্বালানি, মোবাইল ডেটা ও মোটরসাইকেল রক্ষণাবেক্ষণের খরচ বাদ দিলে হাতে খুব বেশি টাকা থাকে না। দূরত্ব ও কাজের চাপ অনুযায়ী ডেলিভারি চার্জ নির্ধারণ করা এবং রাইডারদের সংসার চালানোর মতো আয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

পারিশ্রমিকের পাশাপাশি অন্যায্য পেনাল্টি এবং অ্যাকাউন্ট স্থগিতের (সাসপেনশন) কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে তীব্র আপত্তি রয়েছে রাইডারদের। তাদের অভিযোগ, অর্ডার বাতিল হওয়া, ডেলিভারিতে দেরি কিংবা গ্রাহকের অসন্তোষের মতো ঘটনায় কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই একতরফাভাবে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। অথচ তীব্র যানজট, রেস্তোরাঁয় খাবার তৈরিতে দেরি কিংবা গ্রাহকের সঠিক অবস্থান খুঁজে না পাওয়ার মতো পরিস্থিতির শিকার প্রায়ই হতে হয় রাইডারদের। 

জুনায়েদ হাসান নামে এক রাইডার ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, যানজট বা রেস্তোরাঁয় খাবার প্রস্তুত হতে দেরি হলে সব সময় তাদের কিছু করার থাকে না কিন্তু ডেলিভারি দিতে দেরি হলে এর দায় রাইডারকে নিতে হয়। যেকোনো অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে রাইডারের বক্তব্য শোনা এবং নিরপেক্ষভাবে ঘটনা যাচাই করার সুযোগ থাকা জরুরি।

শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি পেশাগত সুরক্ষার অভাবকেও বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন তারা। রাইডারদের অভিযোগ, ঝুঁকিপূর্ণ সড়কে কাজ করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়লে চিকিৎসার পুরো খরচ তাদের নিজেদেরই বহন করতে হয়। উপরন্তু, অসুস্থতা বা আঘাতের কারণে কাজ বন্ধ থাকলে আয় হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে হয় তাদের। 

চট্টগ্রামের রাইডার মামুন হোসাইন জানান, রোদ-বৃষ্টি, যানজট ও সড়কের ঝুঁকি নিয়েই তাদের কাজ করতে হয়। দুর্ঘটনায় চিকিৎসার খরচ ও কাজ বন্ধ থাকায় আয় কমে যায়। এ জন্য রাইডারদের দুর্ঘটনাবিমা, জরুরি সহায়তা ও ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

রাইডারদের পাশাপাশি ফুডপ্যান্ডার কমিশন নীতি ও অতিরিক্ত চার্জ নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে পার্টনার রেস্তোরাঁ মালিকদের মধ্যেও। তাদের অভিযোগ, অনলাইন প্ল্যাটফর্মটির মাধ্যমে অর্ডারের সংখ্যা বাড়লেও উচ্চ কমিশন, বিজ্ঞাপন ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ মিটিয়ে প্রত্যাশিত মুনাফা হচ্ছে না। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি রেস্তোরাঁগুলোর জন্য এসব ব্যয় সামলে ব্যবসায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।

রেস্তোরাঁ মালিকরা জানিয়েছেন, চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত কমিশনের বাইরেও প্রচার-প্রচারণা, প্রিমিয়াম প্লেসমেন্ট, বিজ্ঞাপন এবং বিভিন্ন ডিসকাউন্টে অংশ নেওয়ার কারণে বাড়তি খরচের চাপ তৈরি হয়। ফলে দিনশেষে বিক্রি বাড়লেও প্রকৃত মুনাফার অঙ্ক খুবই কম। এ ছাড়া পেমেন্ট ছাড় ও হিসাব-নিকাশের ক্ষেত্রে স্পষ্টতার অভাব রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন অনেক ব্যবসায়ী।

যদিও ফুডপ্যান্ডার নীতিমালা অনুযায়ী চুক্তির সময়ই সুনির্দিষ্ট কমিশন হার নির্ধারণের কথা বলা হয়। তবে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কমিশনের বাইরে বিভিন্ন সেবামূলক চার্জ যুক্ত হওয়ার কারণে বিক্রির বিপরীতে প্রকৃত আয় হিসাব করা জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কমিশন বিরোধে চট্টগ্রামে ফুডপ্যান্ডার সেবা বন্ধের কর্মসূচি

ফুডপান্ডার উচ্চ কমিশন ও বিভিন্ন অতিরিক্ত চার্জের প্রতিবাদে চট্টগ্রামে সেবা বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি (চট্টগ্রাম মহানগর)। ঘোষিত এই কর্মসূচির আওতায় সংশ্লিষ্ট সব রেস্তোরাঁকে ফুডপ্যান্ডার অর্ডার নেওয়ার ট্যাব বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। শুরুতে ৫ অক্টোবর থেকে কর্মসূচি শুরুর কথা থাকলেও পরবর্তীতে ৬ অক্টোবর থেকে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সংগঠনটির নেতারা জানান, কমিশন ও চার্জ কমানোর সুনির্দিষ্ট দাবিগুলো লিখিতভাবে ফুডপ্যান্ডা কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। ফুডপ্যান্ডা কর্তৃপক্ষ দাবিগুলো নিয়ে ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে আলোচনা শেষে আগামী ১৫ অক্টোবরের মধ্যে সিদ্ধান্ত জানানোর আশ্বাস দিয়েছে। দাবি নিয়ে গ্রহণযোগ্য সমাধান না হলে কর্মসূচি আরও কঠোর করার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন রেস্তোরাঁ মালিকেরা।

ডেলিভারি ও রিফান্ড নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগ

রাইডার ও রেস্তোরাঁ মালিকদের পাশাপাশি ফুডপান্ডার সেবা নিয়ে ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন সাধারণ গ্রাহকরাও। খাবার পৌঁছাতে দেরি, অর্ডারে ভুল বা অসম্পূর্ণ খাবার সরবরাহ, আগাম টাকা কেটে নেওয়ার পরও খাবার না পাওয়া কিংবা হঠাৎ অর্ডার বাতিলের মতো নানা অভিযোগে অসন্তোষ বাড়ছে। বিশেষ করে অ্যাপে দেখানো সম্ভাব্য সময়সীমার চেয়ে বাস্তবে অনেক বেশি অপেক্ষা করতে হয় বলে অভিযোগ গ্রাহকদের, যার ফলে প্রায়ই ঠান্ডা ও গুণগত মান হারানো খাবার পৌঁছায়।

যদিও ফুডপান্ডা কর্তৃপক্ষের মতে, অ্যাপের সময়সীমাটি আনুমানিক এবং যানজট, দূরত্ব, খারাপ আবহাওয়া কিংবা একই রাইডারের একাধিক ডেলিভারির কারণে সময় কিছুটা বেশি লাগতে পারে। 

তবে অর্ডারে কোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত গ্রাহক সেবা বা সাপোর্ট পাওয়ার সুযোগ বেশ সীমিত বলেই গ্রাহকদের দাবি। এছাড়া ভুল অর্ডার বা বাতিল হওয়া খাবারের টাকা ফেরত (রিফান্ড) পাওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও রয়েছে তীব্র ক্ষোভ। ক্রেডিট কার্ড বা ব্যাংকিং মাধ্যমে অর্থ ফেরত আসতে বেশ কয়েক কার্যদিবস লেগে যায়, আবার অনেক সময় সেই টাকা সরাসরি প্ল্যাটফর্মের নিজস্ব ওয়ালেটে জমা করে দেওয়া হয়। অভিযোগ নিষ্পত্তির এই পুরো প্রক্রিয়ায় স্পষ্টতা ও দ্রুততার বড় ধরনের অভাব দেখছেন ভুক্তভোগী গ্রাহকেরা।

অভিযোগ নিয়ে ভোক্তা অধিদপ্তরে বৈঠক

ফুডপান্ডার সেবা নিয়ে অভিযোগের বিষয়টি জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর পর্যন্ত গড়িয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে পাওয়া অভিযোগ নিয়ে ফুডপ্যান্ডা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করে অধিদপ্তর। ওই বৈঠকে অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা, যথাসময়ে পণ্য ও সেবা সরবরাহ এবং নির্ধারিত সময়ে সঠিক পণ্য দিতে ব্যর্থ হলে সময়মতো মূল্য ফেরত দেওয়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।

শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

ফুডপান্ডার সেবা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়ে অভিযোগের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে করা মামলাও আলোচনায় এসেছে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ফুডপান্ডা বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দা আমবারীন রেজাসহ পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।

অন্য আসামিরা হলেন, প্রতিষ্ঠানটির সহপ্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক জুবায়ের সিদ্দিকী, পান্ডামার্টের পরিচালক মো. তাবরেজ খান, হেড অব ক্যাটাগরি দিলারা ফারুক এবং সিনিয়র ম্যানেজার মোহাম্মদ সাজেদুল হক। 

‘প্রোটিন অ্যান্ড পেরিশেবল’ নামে প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী শিহাব মাহমুদ বশিরের করা মামলাগুলোতে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।

মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ফুডপান্ডার সহযোগী প্রতিষ্ঠান পান্ডামার্টে পণ্য সরবরাহের পর পাওনা অর্থ পরিশোধে অনিয়ম, পণ্য ফেরত দেখাতে ভুয়া চালান তৈরি এবং বিভিন্ন খাতে অর্থ কেটে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তবে এসব অভিযোগ আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত নয়।

ফুডপান্ডার মূল প্রতিষ্ঠানের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ডেলিভারি হিরো স্টোরস (বাংলাদেশ) অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, বিরোধটি মূলত ব্যবসায়িক লেনদেনসংক্রান্ত এবং তাদের কর্মকর্তারা কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত নন। 

প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, সংশ্লিষ্ট পাঁচ কর্মকর্তা হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন পেয়েছেন।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ফুডপ্যান্ডা বাংলাদেশের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দা আম্বারীন রেজার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন ধরেননি। পরে খুদে বার্তা পাঠিয়েও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।