দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা, হামলা ও কারাবরণের মধ্য দিয়ে যারা বিএনপির রাজনীতি ধরে রেখেছিলেন, তাঁদের অনেকেই এখন দল ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে যথাযথ মূল্যায়ন পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। তাঁদের জায়গায় সুবিধাবাদী, সাবেক আমলা ও হাইব্রিড রাজনীতিকদের প্রভাব বাড়ছে—এমন অভিযোগ করছেন দলের তৃণমূলের একাংশের নেতাকর্মীরা।

তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাদের একাংশকে নানা বিতর্কের মুখে ফেলে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাঁদের বিরুদ্ধে প্রচারিত অভিযোগের প্রেক্ষাপটে দলীয় পর্যায়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে।

বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, সুশাসন ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার নানা উদ্যোগের কথা সামনে এসেছে। তবে দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন এবং সরকার ও দলের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে তাঁদের অংশগ্রহণ নিয়ে অসন্তোষও দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকার রাজনীতিতে প্রভাবশালী কয়েকজন নেতাকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ক নতুন করে এ আলোচনাকে সামনে এনেছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রাম করতে গিয়ে দলের অনেক নেতাকর্মী নিঃস্ব হয়েছেন। কিন্তু সরকার গঠনের পরও তাঁদের জন্য যথাযথ কিছু করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে, কিছু সুবিধাবাদী মানুষ দলে প্রবেশ করায় ত্যাগী নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, এই হতাশা থেকে অনেকে দলীয় কর্মকাণ্ড থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। এতে দল ও দেশ উভয়ই উপকৃত হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন থেকে শুরু করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে বিএনপি এবং দলটির বিভিন্ন নেতার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোর অভিযোগ তুলেছেন দলটির নেতাকর্মীরা। তাঁদের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন অভিযোগ ও বিতর্ক ছড়িয়ে নেতাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী সাইফুল আলম নিরব, মির্জা আব্বাস, তানভীর আহমেদ রবীন, আমিনুল হক, এম এ কাইয়ুম ও ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনের নাম উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মতে, ঢাকার রাজনীতিতে এসব নেতার সাংগঠনিক প্রভাব রয়েছে। তাঁদের বিতর্কিত করা হলে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ নির্বাচনী প্রস্তুতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সম্প্রতি সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কও এ আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। মাদকবিরোধী উদ্যোগের লক্ষ্য নিয়ে সমর্থন থাকলেও তা বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর পদত্যাগের বিষয়টি সামনে আসে।

ইসলামি বক্তা ও জৈনপুরী দরবার শরীফের পীর মুফতি ড. এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী বলেন, ইশরাক হোসেনের উদ্দেশ্য ভালো ছিল, তবে পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। তাঁর মতে, মাদকের বিরুদ্ধে উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে তুলে ধরার সুযোগ ছিল।

গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করে তিনি বলেন, মাদকবিরোধী তৎপরতার মূল উদ্দেশ্যের পরিবর্তে ঘটনাটির বিতর্কিত দিকগুলো বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। এতে ভবিষ্যতে মাদকের বিরুদ্ধে উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে অনেকে নিরুৎসাহিত হতে পারেন বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

দৈনিক জবান-এর সম্পাদক রেজাউল করিম রনিও গণমাধ্যমে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের উপস্থাপনের ধরন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, ইশরাক হোসেনকে ঘিরে প্রচারিত বিভিন্ন তথ্য ও বিতর্কের কারণে মূল বিষয়টি আড়ালে পড়ে গেছে।

অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ড. মাহ্দী আমিন ইশরাক হোসেনের রাজনৈতিক ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ইশরাকের ভূমিকা এবং তাঁর পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য গুরুত্বপূর্ণ।

মাহ্দী আমিন আরও বলেন, ইশরাকের সাম্প্রতিক কাজের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন বা মতভিন্নতা থাকতে পারে। তবে কোনো পদ বা পদত্যাগপত্র দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় ও আত্মত্যাগের মূল্যায়ন করা যায় না। দল, দেশ ও মানুষের কল্যাণে তাঁর অবদান বিবেচনায় নেওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার দেশের কল্যাণে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর থেকেই একটি শ্রেণি নানা ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দল ও সরকার—উভয় ক্ষেত্রেই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে চান বলেও জানান তিনি।

এদিকে, তৃণমূলের নেতাকর্মীদের একাংশের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের ত্যাগ ও নির্যাতনের যথাযথ মূল্যায়ন না হলে দলীয় সাংগঠনিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে নেতাকর্মীদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ত্যাগী নেতাদের সক্রিয় রাখা বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

দলের ভেতরে ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন, সুবিধাবাদীদের প্রভাব এবং রাজনৈতিক বিতর্ক মোকাবিলার কৌশল—এই তিনটি বিষয় এখন বিএনপির সাংগঠনিক ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য হয়ে উঠেছে।