একই সপ্তাহে, একই দেশ সৌদি আরবে ঘটেছে দুটি ঘটনা। একদিকে, আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে শ্রীলঙ্কার এক প্রবাসী শ্রমিকের মৃত্যুদণ্ড বাতিল হয়েছে। অন্যদিকে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর দুই বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর জেনেছে বাংলাদেশ। এই দুই ঘটনা বিদেশে কর্মরত নাগরিকদের সুরক্ষায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কূটনৈতিক তৎপরতার প্রশ্ন সামনে এনেছে।
গত ১৩ অক্টোবর সৌদি আরবের সুপ্রিম কোর্ট শ্রীলঙ্কার প্রবাসী শ্রমিক অনোজান সিভারাসার মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে। ফেসবুকে মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে সেপ্টেম্বরে তাঁর মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল। শ্রীলঙ্কা সরকার বিষয়টি নিয়ে আইনি উদ্যোগ নেয়। রাষ্ট্রপতির তত্ত্বাবধানে বিশেষ আইনি দল রিয়াদে যায়, সরকার আইনি ব্যয় বহন করে এবং ১১ অক্টোবর আপিল দাখিল করা হয়। এর দুই দিন পরই মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিল হয়। শ্রীলঙ্কার এই উদ্যোগ দেখিয়েছে, বিদেশে আটক নাগরিকের পক্ষে সময়মতো আইনি সহায়তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এর ঠিক পরদিন, ১৪ অক্টোবর, সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নজরুল ইসলাম ও সুইটি আখতারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। মক্কার একটি মসজিদে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তাঁদের এ সাজা দেওয়া হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কখন তাঁদের গ্রেপ্তার, বিচার ও সাজা কার্যকরের বিষয়ে অবগত হয়েছিল। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর গণমাধ্যমে খবর আসার পর বিষয়টি সামনে আসে। পরে জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট বিস্তারিত জানতে চিঠি পাঠায়।
এখানে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর জরুরি। নজরুল ইসলাম ও সুইটি আখতারের গ্রেপ্তার ও বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে বাংলাদেশ মিশন আগে থেকে জানত কি না? তাঁদের আইনি সহায়তা দেওয়া হয়েছিল কি না? মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ ছিল কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট না হলে দায়িত্বের ঘাটতি কোথায় ছিল, তা নির্ধারণ করা কঠিন। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার বিদেশে কোনো নাগরিক গুরুতর আইনি জটিলতায় পড়লে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর জন্য কার্যকর কনস্যুলার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ঘটনাটিকে প্রবাসীদের জন্য ‘বড় শিক্ষা’ হিসেবে উল্লেখ করে বিদেশের আইন মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। নিঃসন্দেহে, যে দেশে একজন নাগরিক বসবাস বা কাজ করেন, সেই দেশের আইন মেনে চলা তাঁর দায়িত্ব। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্বও সেখানেই শেষ হয়ে যায় না। বিদেশে গ্রেপ্তার হওয়া নাগরিকের পরিবারকে তথ্য দেওয়া, আইনি প্রক্রিয়া বোঝাতে সহায়তা করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইনজীবীর সহায়তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়াও কূটনৈতিক দায়িত্বের অংশ।
দুই বাংলাদেশির মৃত্যুর পর তাঁদের মরদেহ নিয়ে একটি মন্তব্যও নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। গত ১৭ অক্টোবর একটি বেসরকারি টেলিভিশনের আলোচনায় মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান রতন বলেছিলেন, ‘এই পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না।’ মন্তব্যটি নিয়ে প্রবাসীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। পরে ১৯ অক্টোবর তিনি ফেসবুকে দুঃখ প্রকাশ করে বক্তব্য প্রত্যাহার ও ক্ষমা চান। একজন জনপ্রতিনিধির বক্তব্যে শোকাহত পরিবারের অনুভূতি ও মর্যাদার বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়া উচিত। মৃত্যুদণ্ডের অভিযোগ বা অপরাধের বিচার নিয়ে আলোচনা হতে পারে, কিন্তু তাতে মৃত ব্যক্তির পরিবারের প্রতি মানবিকতা হারিয়ে ফেলার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান অপরিসীম। জীবিকার সন্ধানে মানুষ পরিবার ছেড়ে বিদেশে যান, ঋণ করে যাত্রা শুরু করেন, কঠোর পরিশ্রম করে দেশে অর্থ পাঠান। নজরুল ইসলামের বাবা ছয় লাখ টাকা ঋণ করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন । এখন পরিবারের চাওয়া, অন্তত ছেলের মরদেহ দেশে এনে শেষবারের মতো দেখতে পাওয়া। এই অপেক্ষা শুধু একটি পরিবারের নয়; বিদেশে বিপদে পড়া নাগরিকের পাশে রাষ্ট্র কতটা কার্যকরভাবে দাঁড়াতে পারে, সেই বৃহত্তর প্রশ্নও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
শ্রীলঙ্কার ঘটনা থেকে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো কনস্যুলার সুরক্ষা কেবল আনুষ্ঠানিক যোগাযোগে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বিদেশে কোনো বাংলাদেশি গ্রেপ্তার হলে দ্রুত তথ্য সংগ্রহ, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ, আইনি সহায়তার প্রয়োজন নিরূপণ এবং বিচারপ্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলো পর্যবেক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। একই সঙ্গে বিদেশি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তথ্য বিনিময় ও মৃত্যুদণ্ডের মতো গুরুতর সাজা কার্যকরের আগে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক যোগাযোগের সুযোগ কতটা রয়েছে, তা পর্যালোচনা করা জরুরি।
প্রবাসীরা শুধু রেমিট্যান্স পাঠানোর মাধ্যম নন; তাঁরা বাংলাদেশের নাগরিক। তাঁদের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় রাষ্ট্রের দায়িত্বও তাই স্পষ্ট। শ্রীলঙ্কার উদ্যোগের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবস্থার তুলনা করে প্রশ্ন তোলা অযৌক্তিক নয়। তবে সেই তুলনা যেন কেবল ক্ষোভে সীমাবদ্ধ না থাকে বরং কোথায় ঘাটতি ছিল, কীভাবে তা দূর করা যায় এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তার জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
প্রশ্নটি তাই শুধু এই নয়, দুই বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর আমরা কখন পেয়েছি। প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যতে কোনো বাংলাদেশি বিদেশে এমন সংকটে পড়লে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর জন্য আমরা কতটা প্রস্তুত থাকব?
মামুনুর রশিদ খাঁন: সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত), দুরবীন নিউজ ।









