দেশে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে ১ হাজার ১৩টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৭৩ জন নিহত ও ৬ হাজার ৪৭৩ জন আহত হয়েছেন। এসব ঘটনার ৯১ শতাংশের সঙ্গে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল কিংবা দলটির সঙ্গে অন্য রাজনৈতিক দলের সংঘাতের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। একই সময়ে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ৩৯৮টি ঘটনায় ১৮৭ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া কারাগারে মারা গেছেন ৯৫ জন বন্দি এবং নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন ৫১৮ জন সাংবাদিক।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সোমবার (১৯ অক্টোবর) প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। ১৬টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ এবং সংগঠনটির নিজস্ব তথ্য ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহতদের মধ্যে বিএনপির ৪৬ জন, জামায়াতে ইসলামীর ৮ জন এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ৬ জন রয়েছেন। এ ছাড়া চরমপন্থী গোষ্ঠীর একজন এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সদস্য বা রাজনৈতিক পরিচয় অজানা ১২ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একজন সাধারণ নারীও রয়েছেন।
রাজনৈতিক সহিংসতায় বিএনপির সংশ্লিষ্টতা
এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ৩৪২টি ঘটনায় ২ হাজার ৬৩২ জন আহত ও ৪০ জন নিহত হয়েছেন। বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ৩২১টি সংঘর্ষে ২ হাজার ১৯০ জন আহত এবং ১১ জন নিহত হয়েছেন। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে ৯৩টি সংঘর্ষে ৫৪৫ জন আহত ও ৯ জন নিহত হয়েছেন।
এ ছাড়া বিএনপি ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে ৪৭টি সংঘর্ষে ৩২০ জন আহত হয়েছেন। আওয়ামী লীগ ও এনসিপির মধ্যে পাঁচটি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৫৮ জন। আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যে দুটি সংঘর্ষে তিনজন আহত ও একজন নিহত হয়েছেন। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের একটি ঘটনায়ও একজন নিহত হয়েছেন।
বিএনপি ও অন্যান্য দলের মধ্যে ১২৮টি সংঘর্ষে ৩২০ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, অন্যান্য ছোট-বড় রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৭৪টি সংঘর্ষের ঘটনায় ৪০৫ জন আহত এবং ১১ জন নিহত হয়েছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোট ১ হাজার ১৩টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনার মধ্যে ৯৩১টি, অর্থাৎ প্রায় ৯১ শতাংশ, বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল কিংবা দলটির সঙ্গে অন্য রাজনৈতিক দলের সংঘাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় নিহত ১৩
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নয় মাসে ৪০২টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ২ হাজার ৬২৩ জন আহত এবং ১৩ জন নিহত হয়েছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচন-পূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ছয় শতাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর ও নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় নিহতদের মধ্যে বিএনপির ৯ জন, জামায়াতের দুজন, আওয়ামী লীগের একজন এবং রাজনৈতিক পরিচয় অজানা একজন রয়েছেন।
দলভিত্তিক হিসাবে, বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ১২৩টি ঘটনায় ৯৪১ জন আহত ও আটজন নিহত হয়েছেন। বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে ২৩৪টি সংঘর্ষে ১ হাজার ৪৩৮ জন আহত এবং চারজন নিহত হয়েছেন। বিএনপি-আওয়ামী লীগের তিনটি সংঘর্ষে তিনজন আহত ও একজন নিহত হয়েছেন।
এ ছাড়া বিএনপি-এনসিপির মধ্যে ১৬টি সংঘর্ষে ১৪১ জন এবং বিএনপি ও অন্যান্য দলের মধ্যে ১৭টি ঘটনায় ৬৩ জন আহত হয়েছেন। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে ১০টি সংঘর্ষের ঘটনায় আহত হয়েছেন ৩৮ জন।
হামলা, চাঁদাবাজি ও গ্রেপ্তার
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থিতা, সমাবেশ, প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ এবং চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে অধিকাংশ রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় বাড়িঘর, যানবাহন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দলীয় কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ রয়েছে।
নয় মাসে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার অন্তত ৮৮টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় কমপক্ষে ১০০ জন আহত এবং ৫২ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিএনপির ৩০ জন, আওয়ামী লীগের ১১ জন, জামায়াতের পাঁচজন এবং অন্যান্য দলের ছয়জন রয়েছেন। রাজনৈতিক সহিংসতায় দেড় শতাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ২৭০টির বেশি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৫ হাজার ৮০৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং ৩২ হাজার ৪৩৩ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
মামলাগুলোতে বিভিন্ন দলের ৫ হাজার ৬৪৪ জন নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে আওয়ামী লীগের ৪ হাজার ৮২৭ জন, বিএনপির ৬০৯ জন, জামায়াতের ১৪৫ জন, এনসিপির ৪৩ জন এবং চরমপন্থী গোষ্ঠীর ৩৭ জন রয়েছেন।
এ ছাড়া সন্ত্রাস, নাশকতা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি গ্রেপ্তার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযানে ৬৩ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।









