গাজীপুর-বিমানবন্দর বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প বাতিল করে এর অবকাঠামো সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)। সংগঠনটির মতে, এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সরকার সবচেয়ে খারাপ বিকল্পটি বেছে নিয়েছে। দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে নির্মাণকাজের কারণে দুর্ভোগ পোহানো গাজীপুর ও উত্তরার বাসিন্দাদের প্রত্যাশা ও যাতায়াতের চাহিদার প্রতিও সুবিচার করা হয়নি।

মঙ্গলবার বিআইপির সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসানের পাঠানো এক বিবৃতিতে এসব কথা বলা হয়। সংগঠনটি সরকারের এ সিদ্ধান্তকে টেকসই, জ্বালানি সাশ্রয়ী ও সবার ব্যবহার উপযোগী গণপরিবহন ব্যবস্থার ইতিহাসে ‘কালো দিন’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

গত ১৮ অক্টোবর মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিআরটি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, করিডরের স্টেশন ও লেন বিভাজক সরিয়ে সড়কটি দুই পাশে তিনটি করে মোট ছয় লেনের সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তর করা হবে। এ ছাড়া প্রকল্পের দুটি দুই লেনের ওভারপাস চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট পিএলসি বন্ধ করে এর কার্যক্রম সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) আওতায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বিআইপি এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির মতে, বিআরটি বাতিলের সিদ্ধান্ত পরিকল্পিত গণপরিবহন ব্যবস্থার ধারণার পরিপন্থি। দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণকাজের কারণে দুর্ভোগ পোহানো গাজীপুর ও উত্তরার বাসিন্দাদের যাতায়াতের প্রয়োজন এবং উন্নত গণপরিবহন পাওয়ার প্রত্যাশাকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

বিবৃতিতে বিআইপি জানায়, সংবাদপত্রের প্রতিবেদন থেকে তারা সরকারের এ সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানতে পেরেছে। মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে বিষয়টি প্রকাশ না করার সমালোচনা করে সংগঠনটি বলেছে, এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ও নানা জল্পনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় স্বার্থের সংঘাত রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছে সংগঠনটি।

বিআইপির অভিযোগ, এ সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকারী এবং দেশি-বিদেশি নির্মাণ খাতের প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছে। একই সঙ্গে এটি গাজীপুর ট্রান্সপোর্ট মাস্টার প্ল্যান এবং ঢাকার সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনার প্রস্তাবনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

বিআরটি বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারসহ ছয় দফা দাবি জানিয়েছে বিআইপি। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে বিআরটি ও মেট্রোরেলের পরিচালনা এবং সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের সমন্বয়ের জন্য একটি সমন্বিত সংস্থা গঠন। এ ছাড়া ঢাকা মহানগরীসহ পুরো ঢাকা অঞ্চলে এবং দেশের অন্যান্য মহানগরে বৃহত্তর পরিসরে বিআরটি পরিকল্পনা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

বিআইপি মনে করে, পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নে বিচ্ছিন্নভাবে প্রকল্পভিত্তিক সিদ্ধান্ত না নিয়ে সামগ্রিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে এগোতে হবে। একই সঙ্গে বাস্তবায়নে সময় ও ব্যয় সাশ্রয় করে অধিকসংখ্যক মানুষকে সেবা দেওয়া সম্ভব—এমন প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

গণপরিবহন পরিকল্পনায় নারী, স্বল্প দূরত্বের যাত্রী, শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং সীমিত আর্থিক সামর্থ্যের মানুষের যাতায়াতের প্রয়োজন বিবেচনায় নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে সংগঠনটি।

এ ছাড়া বৃহত্তর ঢাকার পরিবহন পরিকল্পনাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষকে (ডিটিসিএ) নেতৃত্বদানকারী সংস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছে বিআইপি। এ লক্ষ্যে সংস্থাটিকে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছে তারা।

উল্লেখ্য, বিআরটি বাতিলের সিদ্ধান্তের আগে প্রকল্পটির কারিগরি দিক পর্যালোচনা করেছিল বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি বিশেষজ্ঞ দল। অধ্যাপক সামছুল হকের নেতৃত্বাধীন দলটি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত দুটি কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে বিআরটি বাতিল এবং বিদ্যমান অবকাঠামো উন্নত মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহারের সুপারিশ করেছিল।