ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে দেশে আতঙ্ক ও অস্থিরতা তৈরির নানা অপতৎপরতার অভিযোগ উঠেছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গুলিবর্ষণ, ককটেল বিস্ফোরণ, হুমকি-ধমকি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও ঝটিকা মিছিলের ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। কোথাও কোথাও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে জনমনে আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা চলছে। তবে এসব ঘটনার পেছনে কারা জড়িত এবং তাদের উদ্দেশ্য কী, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ জানিয়েছেন, একটি কুচক্রী মহল পরিকল্পিতভাবে আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা করছে। এর মাধ্যমে পুলিশ ও প্রশাসনের মনোবল ভেঙে দেওয়ার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন। তবে এসব চেষ্টা সফল হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি জানান, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী ও উসকানিদাতাদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ কাজ করছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আগামী দিনগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান আরও জোরদার করা হবে।

গত ২২ অক্টোবর নওগাঁর মান্দা উপজেলায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় মাইকে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়ে প্রচারের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক আলোচনা ও জনমনে উদ্বেগ তৈরির উদ্দেশ্যে এ ধরনের তৎপরতা চালানো হতে পারে।

বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল অভিযোগ করেছেন, ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ষড়যন্ত্র করছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পেছনে কারা রয়েছে, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। আওয়ামী লীগের কেউ কিংবা অন্য কোনো পক্ষ এসব ঘটনায় জড়িত থাকলে তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

রাজনৈতিক উত্তেজনার পাশাপাশি সাম্প্রতিক সহিংসতার ঘটনায় উদ্বেগ ছড়িয়েছে সংস্কৃতি অঙ্গনেও। শনিবার ভোরে রাজধানীর মগবাজারে বিশাল সেন্টারের সামনে সংগীতশিল্পী ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সাবেক পরিচালক আসিফ আকবরের ব্যক্তিগত গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। এ সময় গাড়িতে আসিফ আকবর বা তাঁর চালক কেউই ছিলেন না। গুলিতে গাড়ির কাচ ভেঙে যায়। ঘটনাস্থল থেকে একটি গুলির খোসা উদ্ধার করেছে পুলিশ।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সিসিটিভি ফুটেজে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে নেমে একজনকে গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালাতে দেখা গেছে। হামলাকারীকে শনাক্ত করতে আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। ঘটনার পেছনে ব্যক্তিগত বিরোধ কিংবা অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

এর আগে রাজধানীর হাজারীবাগে এজেআর কুরিয়ার সার্ভিসের কার্যালয় ও গুদামে হামলা, ভাঙচুর এবং লুটপাটের ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, একদল দুর্বৃত্ত প্রতিষ্ঠানটির জমির ভাড়া শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের লোকদের দিতে হুমকি দেয়। এ ঘটনায় করা মামলার বাদী ও প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক আফসার উদ্দিনকে পরে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।

হুমকিদাতারা এক দিনের মধ্যে মামলা তুলে না নিলে তাঁকে হত্যা করা হবে বলে জানায়। পুলিশ জানিয়েছে, হুমকি দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত মোবাইল সিমের নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। কথোপকথনের অডিও পরীক্ষা করে ঘটনাটিও তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়েছে। কুরিয়ার সার্ভিসের কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের তথ্যও পাওয়া গেছে।

এদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম ও বিভিন্ন ভার্চুয়াল নম্বর ব্যবহার করে রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। পরিচয় ও অবস্থান গোপন রাখতে কেউ কেউ ভিপিএন ব্যবহার করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব হুমকির উদ্দেশ্য হিসেবে জনমনে আতঙ্ক তৈরি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল দুর্বল করার বিষয়টি উল্লেখ করা হচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এ ধরনের হুমকির অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। সংশ্লিষ্ট ফোন নম্বর, অ্যাকাউন্ট, বার্তা, অডিও এবং অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য যাচাই করে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগলে সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযোগ জানানো এবং হুমকির বার্তা বা অডিও সংরক্ষণের পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।

এদিকে খুলনা ও আশপাশের এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে খুন, গুলিবর্ষণ ও চাঁদাবাজির একাধিক ঘটনা ঘটেছে। গত ২২ অক্টোবর মাত্র ১৪ ঘণ্টার ব্যবধানে পৃথক দুটি ঘটনায় দুজন নিহত হন। এর মধ্যে লবণচরা থানার জিন্নাহপাড়া এলাকায় খুশি বেগম নামের এক তরুণীকে তাঁর মায়ের সামনে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। একই দিনে তুষার নামের আরেক তরুণ গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। শনিবার তেরখাদা উপজেলায় এক স্থানীয় যুবদল নেতাকে লক্ষ্য করেও গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে।

বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকির জানিয়েছেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী যৌথ অভিযান চলছে। পুলিশি কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো তৈরির কাজও চলছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে গুজব ও আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। তবে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর সুযোগ দেওয়া হবে না বলে তিনি জানান।

সাম্প্রতিক এসব ঘটনার পেছনে কারা জড়িত, তা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত ও তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে গুজব প্রতিরোধ, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।