জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে জাপান পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান এবং সফরসঙ্গীদের বহনকারী বাংলাদেশ বিমানের একটি নিয়মিত ফ্লাইট জাপানের স্থানীয় সময় সকালে নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নাকাসোনে ইয়াসুতাকা।

এ সময় প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. মো. শাকিরুল ইসলাম খান এবং টোকিওতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সফরকালে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন তারেক রহমান। বৈঠকে দুই দেশের বিদ্যমান কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও জোরদার, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। বৈঠক শেষে যৌথ বিবৃতি প্রকাশ এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রীর আয়োজনে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।

এ সফরে জাপানের বিভিন্ন বড় কোম্পানি ও উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি ‘জাপান-বাংলাদেশ ইকোনমিক ফোরাম’-এ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন তিনি।

আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাবে বাংলাদেশ-জাপান ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (ইপিএ) কার্যকর করা, জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক জোরদার করা। এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ প্রশিক্ষণের বিষয়গুলোও আলোচনায় স্থান পাবে।

সফরসূচি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ‘জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগ’ এবং ‘জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন’-এর চেয়ারম্যানদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এ ছাড়া জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা), জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি), জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) এবং সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও তাঁর বৈঠকের কথা রয়েছে।

সফরের অংশ হিসেবে চিবা প্রিফেকচারের ফুত্তসু শহরে একটি এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করবেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া নাগোয়া শহরে ইউনিক্লোর সদর দপ্তর এবং টয়োটার কারখানা পরিদর্শনের কর্মসূচিও রয়েছে।

দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে কৃষি, মৎস্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসামরিক বিমান চলাচল, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে সমঝোতা স্মারক ও সহযোগিতা চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। সফরকালে কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রায় আটটি সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, যার মধ্যে তিন থেকে চারটি স্বাক্ষরিত হতে পারে। শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নেও পৃথক চুক্তির বিষয়ে আলোচনা চলছে।

বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে জাপানি সহযোগিতা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান, জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসনে সহযোগিতার বিষয়গুলো আলোচনায় আসতে পারে।

সফরের প্রাক্কালে ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত ১২টি অগ্রাধিকার খাতে প্রায় ১৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি বিনিয়োগ প্যাকেজের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বিনিয়োগের মধ্যে পরিবহন ও নগর সংযোগ, মাতারবাড়িসহ শিল্প ও বন্দর অবকাঠামো, উৎপাদন শিল্প, সেমিকন্ডাক্টর, অটোমোবাইল, জ্বালানি এবং জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো খাত রয়েছে। এ ছাড়া কৃষি, ওষুধশিল্প, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, নীল অর্থনীতি, পর্যটন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পেও বিনিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীদের মধ্যে রয়েছেন তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, ইনভেস্ট বাংলাদেশ অথরিটির চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মো. শাকিরুল ইসলাম খানসহ সরকারি কর্মকর্তা ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা।

১৯৭২ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে জাপান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। ঢাকা মেট্রোরেলসহ দেশের বিভিন্ন বড় অবকাঠামো প্রকল্পে জাপানের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও জোরদার করা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে এ সফরকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।