কর্ণফুলী নদীর ওপর দেশের প্রথম চার লেনের ক্যাবল-স্টেইড সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর। রাঙামাটির কাপ্তাই ও চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার সংযোগস্থলে চন্দ্রঘোনা-রাইখালী ফেরিঘাট এলাকায় নির্মিতব্য ৫৩২ মিটার দীর্ঘ সেতুটিতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা। সেতুটি চালু হলে রাঙামাটি, চট্টগ্রাম ও বান্দরবান জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের ফেরি পারাপারের ভোগান্তি কমবে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সেতুটির মূল কাঠামো স্টিল ও কংক্রিটের সমন্বয়ে নির্মাণ করা হবে। এর সঙ্গে থাকবে ৪৫৫ মিটার ভায়াডাক্ট এবং ১ হাজার ২৫০ মিটারের বেশি দীর্ঘ এলিভেটেড সড়ক। সেতুতে আধুনিক ব্রিজ স্মার্ট হেলথ মনিটরিং সিস্টেম এবং স্বয়ংক্রিয় টোল প্লাজা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। সেতুর অবস্থা ও স্থায়িত্ব নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে।

সওজের রাঙামাটি বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা জানান, রাঙামাটি-বান্দরবান আঞ্চলিক মহাসড়কের (আর-১৬১) ২১তম কিলোমিটারে সেতুটি নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য ৭ দশমিক ৫২ হেক্টর জমি অধিগ্রহণে ২৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, সেতুর চূড়ান্ত নকশা তৈরি করে প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে পাঠানো হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখন ডিপিপি পুনর্গঠন করে পুনরায় পাঠাতে হবে। এরপর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হবে। ২০৩১ সালের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করে সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।

ক্যাবল-স্টেইড সেতুতে উঁচু পাইলন বা স্তম্ভের সঙ্গে যুক্ত শক্তিশালী ইস্পাতের তারের মাধ্যমে সেতুর চলাচলের পথের ভার বহন করা হয়। এ ধরনের নকশায় দীর্ঘ স্প্যান তৈরি করা সম্ভব হয়। ফলে নদীর মাঝখানে পিলারের প্রয়োজন কমে এবং নৌযান চলাচল ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের ওপর প্রভাব সীমিত রাখা যায়।

ফেরি পারাপারে দীর্ঘদিনের ভোগান্তি

রাঙামাটির সঙ্গে রাজস্থলী ও বান্দরবান জেলার যোগাযোগ সহজ করতে কর্ণফুলী নদীর চন্দ্রঘোনায় ফেরি সার্ভিস চালু করা হয়। দীর্ঘ সময় পার হলেও বর্তমানে একটি ফেরির মাধ্যমেই দুই পাড়ের যানবাহন পারাপার করতে হচ্ছে। পন্টুনের সমস্যা, ডুবোচর এবং নদীর তীব্র স্রোতের কারণে প্রায়ই ফেরি চলাচল ব্যাহত হয়।

নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা জানান, বর্তমানে ফেরিতে একবারে মাত্র ৮ থেকে ১০টি ট্রাক বা বাস এবং ১৫ থেকে ২০টি ছোট ও হালকা যানবাহন পারাপার করা যায়। নদী পার হতে আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় লাগে। স্রোত বেড়ে গেলে, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বাঁধের গেট খুলে দিলে কিংবা নদীতে পানির উচ্চতা কমে গেলে ফেরি চলাচল বন্ধ রাখতে হয়।

চন্দ্রঘোনার ব্যবসায়ী ফরিদ আহমদ বলেন, প্রতিদিন এ ফেরিঘাট দিয়ে প্রায় ৯০০ থেকে ১ হাজার ছোট-বড় যানবাহন পারাপার হয়। কিন্তু ফেরির কারণে প্রতিনিয়ত ভোগান্তি পোহাতে হয়। অনেক মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছোট সাম্পানে নদী পার হন।

তিনি জানান, রাঙামাটি, চট্টগ্রাম ও বান্দরবান জেলার কয়েক লাখ মানুষ এই ফেরির ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি পর্যটকদের কাছেও তিন পার্বত্য জেলা ঘুরে কক্সবাজার যাওয়ার এ পথটি গুরুত্বপূর্ণ।

কাপ্তাইয়ের রাইখালী ইউনিয়নের বাসিন্দা থোয়াই অং মারমা বলেন, ফেরি বন্ধ থাকলে এলাকার মানুষের চলাচলও থেমে যায়। অল্প দূরত্ব পার হতে ৪৫ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা, কখনো তারও বেশি সময় লাগে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন জরুরি রোগীরা। রাতেও অ্যাম্বুলেন্সকে ফেরির জন্য অপেক্ষা করতে হয়।

রাইখালী বাজারের ব্যবসায়ী তনয় তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ফেরির সমস্যার কারণে পাহাড়ি এলাকার কৃষিপণ্য সময়মতো বাজারে পৌঁছানো যায় না। কখনো ফেরি বিকল হয়ে মাঝনদীতে আটকে পড়ে। সেতু নির্মিত হলে বান্দরবান ও রাঙামাটির সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে।

ট্রাকচালক রহিম উদ্দিন জানান, প্রতিদিন ইট পরিবহনের কাজে তাকে ফেরি ব্যবহার করতে হয়। কখনো দ্রুত নদী পার হওয়া গেলেও কখনো দীর্ঘ যানজটে আটকে থাকতে হয়। সেতুটি নির্মিত হলে সময়ের অপচয় ও ঝুঁকি দুটোই কমবে।

পর্যটন ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে সম্ভাবনা

সওজের উপসহকারী প্রকৌশলী কীর্তি নিশান চাকমা বলেন, সেতুটি শুধু যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নই করবে না, রাঙামাটি ও বান্দরবানের পর্যটনশিল্পের বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। দুই পার্বত্য জেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে পর্যটনশিল্পের সম্প্রসারণে এটি মাইলফলক হতে পারে।

কাপ্তাই উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান দিলদার হোসেন বলেন, চন্দ্রঘোনায় সেতু নির্মাণ এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কৃষিপণ্য পরিবহন সহজ হবে এবং এলাকার আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটবে।

রাজস্থলী উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাস্টার খলিলুর রহমান শেখ বলেন, সেতুটি নির্মিত হলে বান্দরবান, রাজস্থলী, চন্দ্রঘোনা, রাইখালী, রাঙ্গুনিয়া ও কাপ্তাই এলাকার মানুষের যাতায়াত সহজ হবে। পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির মাধ্যমে আঞ্চলিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

সংশ্লিষ্টদের আশা, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ফেরিনির্ভর যোগাযোগের অবসান ঘটবে। একই সঙ্গে তিন জেলার মানুষের যাতায়াত, জরুরি চিকিৎসাসেবা, কৃষিপণ্য পরিবহন ও পর্যটন কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।