ঢাকা ওয়াসার পদ্মা (যশলদিয়া) পানি শোধনাগার প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। নিম্নমানের পাইপ ব্যবহার, পানি সরবরাহের প্রয়োজনীয় লাইন নির্মাণ না করা এবং নির্ধারিত পরিমাণ পানি সরবরাহ নিশ্চিত না করেই ঠিকাদারকে চূড়ান্ত বিল ও জামানতের অর্থ পরিশোধের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব অনিয়মের কারণে ওয়াসা ও সরকারের সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানা, ঢাকা ওয়াসার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান, প্রকল্প পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম এবং চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশ প্রতিনিধি ও পরামর্শক আজিজুল আকিল ডেভিডের বিরুদ্ধে এ দুর্নীতিতে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় দায় নির্ধারণের বিষয়টি এখনো গুরুত্বপূর্ণ।

ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে পদ্মা নদীর পানি মুন্সীগঞ্জের যশলদিয়ায় শোধন করে ঢাকায় সরবরাহের লক্ষ্যে প্রকল্পটি নেওয়া হয়। কিন্তু প্রকল্পের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সরবরাহব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। পরীক্ষামূলকভাবে একাধিক পাম্প চালুর সময় পাইপ ফেটে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এরপরও ঠিকাদারকে চূড়ান্ত বিল ও জামানতের অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পে পাইপ কেনার জন্য প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, পাইপ কেনাকাটায় প্রায় ৫০০ কোটি টাকা অনিয়ম হয়েছে। এ ছাড়া ওয়ারেন্টির আওতায় থাকা ত্রুটি ওয়াসার অর্থে মেরামতের পরও ঠিকাদারকে ৩৬০ কোটি টাকার জামানত ফেরত দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ লাইন নির্মাণ করা সম্ভব হলেও তা করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

ওয়াসার দেওয়া উৎপাদনসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্প থেকে দৈনিক গড়ে প্রায় ২০ কোটি লিটার পানি কম সরবরাহ হচ্ছে। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এই ঘাটতি প্রায় ৪৪ শতাংশ। সংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, দীর্ঘ সময়ের উৎপাদন ঘাটতির পানির সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্য প্রায় ১ হাজার ৬২ কোটি টাকা। পাইপ কেনাকাটায় কথিত অনিয়মের অর্থ যুক্ত করে মোট সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়েছে। তবে এই অঙ্ক সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্য ও অভিযোগে উল্লেখ করা অর্থের সমষ্টি; এটি নিরীক্ষিত নিট আর্থিক ক্ষতির হিসাব নয়।

প্রকল্পের কারিগরি অনিয়মের বিষয়ে জানা যায়, একপর্যায়ে নিম্নমানের পাইপ সরবরাহের অভিযোগ ওঠে। প্রকল্পের তৎকালীন পরিচালক প্রকৌশলী এমএ রশীদ সিদ্দিকী নির্দিষ্ট ধরনের পাইপ সরবরাহে আপত্তি জানিয়ে ঠিকাদারকে চিঠি দেন। পরে তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হয় উপপ্রকল্প পরিচালক রফিকুল ইসলামকে।

রশীদ সিদ্দিকীর অভিযোগ, নিম্নমানের পাইপ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানোর কারণেই তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরানো হয়েছিল। তাঁর দাবি, পরে পাইপের মান যাচাইয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মাধ্যমে পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, পাইপের মান যাচাইয়ের ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। বরং প্রকল্পের কারিগরি আপত্তি উপেক্ষা করে নিম্নমানের পাইপ ব্যবহার করা হয়েছে। এর ফলে প্রকল্পের স্থায়িত্ব ও পানি সরবরাহের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

প্রকল্পের পূর্ণ সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য পাঁচটি পাম্প একসঙ্গে চালু করা হলে ইনটেক ও শোধনাগারের মধ্যবর্তী সঞ্চালন লাইনের দুটি স্থানে পাইপ ফেটে যায়। এতে সড়ক ভেদ করে পানি বেরিয়ে আসে এবং একটি ভবনের দেয়ালও ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। পরে সংস্কারকাজ করা হলেও পাঁচটি পাম্প একসঙ্গে চালিয়ে আর পূর্ণ সক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া প্রকল্পে ‘আনরিফাইন্ড সয়েল সিমেন্ট কলাম’ পদ্ধতি ব্যবহারের প্রস্তাব নিয়েও আপত্তি উঠেছিল। ডেনমার্কের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গ্রন্টমিজের টিম লিডার ও কন্ট্রাক্ট স্পেশালিস্ট বোদো গোপাট পদ্ধতিটিকে আন্তর্জাতিক মানসম্মত নয় বলে প্রত্যাখ্যান করেন। এ নিয়ে প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয় বলে জানা গেছে।

প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পরামর্শক হিসেবে আজিজুল আকিল ডেভিডের নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রকল্প পরিচালক রফিকুল ইসলামের চাপেই তাঁকে চীনা ঠিকাদারের পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। ডেভিডের বিরুদ্ধে প্রকল্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে ডেভিডের বক্তব্য, সরকার বিষয়টি তদন্ত করছে এবং তদন্তে যাঁরা দোষী সাব্যস্ত হবেন, তাঁদের শাস্তি হওয়া উচিত।

ওয়াসা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী ড. গোলাম মোস্তফা জানিয়েছেন, শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট মোকাবিলায় বোর্ড বারবার সরবরাহ লাইন নির্মাণের প্রকল্প নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল। অর্থের সংস্থান থাকা সত্ত্বেও তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেননি। এতে প্রকল্পের নির্মাণমান নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। তাঁর মতে, এ বিষয়ে কারিগরি নিরীক্ষা প্রয়োজন।

নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, ওয়াসার কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, ঠিকাদার ও সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের কিছু ব্যক্তির যোগসাজশে প্রকল্পে বড় ধরনের দুর্নীতি হয়ে থাকতে পারে। দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

এদিকে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, আগের সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটির প্রতিবেদন দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানো হয়েছে। দুদকের বিস্তারিত তদন্তে অনিয়মের বিষয়গুলো উঠে এলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার কোনো দুর্নীতিবাজকে ছাড় দেবে না।