যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি কোম্পানি শেভরনকে সিলেটের ১২ নম্বর গ্যাস ব্লকের অবশিষ্ট এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের সুযোগ দিতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে পেট্রোবাংলা। তবে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চল নিয়ে গঠিত ১১ নম্বর ব্লক আপাতত শেভরনকে দেওয়ার পক্ষে নয় সংস্থাটি। এ ক্ষেত্রে নতুন গ্যাস আবিষ্কৃত হলে প্রস্তাবিত অনশোর মডেল উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (পিএসসি) অনুযায়ী দাম নির্ধারণের শর্ত দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি শেভরনের সঙ্গে পেট্রোবাংলার একটি কমিটির বৈঠকে এ প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। বৈঠকে জানানো হয়, ১১ ও ১২ নম্বর ব্লক একসঙ্গে নয়, বরং ১২ নম্বর ব্লকের অবশিষ্ট এলাকা অনুসন্ধানের জন্য দেওয়া যেতে পারে। একসময় শেভরন এ এলাকা ছেড়ে দিয়েছিল।

এর আগে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে জ্বালানি খাতসংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকের আওতায় শেভরন ১১ ও ১২ নম্বর ব্লকের ছয় হাজার বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকায় অনুসন্ধানের প্রস্তাব দেয়। কোম্পানিটির ধারণা, সিলেট অঞ্চলে আরও প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ জন্য প্রাথমিকভাবে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করে প্রতিষ্ঠানটি।

শেভরনের প্রস্তাবে বলা হয়, নির্দিষ্ট শর্তে অনুসন্ধানের সুযোগ পেলে দুই বছরের মধ্যে উল্লেখযোগ্য গ্যাস আবিষ্কার সম্ভব। তবে নতুন প্রস্তাবিত অনশোর পিএসসি-২০২৬ অনুযায়ী গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ এবং সিলেট অঞ্চলে পাঁচ হাজার মিটার পর্যন্ত গভীর কূপ খননের শর্ত রয়েছে।

বর্তমানে শেভরনের কাছ থেকে প্রতি ইউনিট গ্যাস ২ দশমিক ৭৬ ডলারে কেনে বাংলাদেশ। অন্যদিকে প্রস্তাবিত পিএসসি অনুযায়ী নতুন গ্যাসের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। ফলে এ চুক্তির আর্থিক শর্ত নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছে।

পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ১১ নম্বর ব্লক আপাতত শেভরনকে দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, ব্লকটি আগে থেকেই বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানির (বাপেক্স) জন্য সংরক্ষিত। এ ব্লকের আওতায় ছাতক, টেংরাটিলা ও সুনেত্র গ্যাসক্ষেত্র রয়েছে। এসব এলাকায় নতুন করে অনুসন্ধান ও কূপ খননের পরিকল্পনাও রয়েছে।

অন্যদিকে ১২ নম্বর ব্লকের আওতায় থাকা বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র থেকে বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৭৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হচ্ছে। তবে ২০৩০ থেকে ২০৩২ সালের মধ্যে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন বিনিয়োগ ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে উৎপাদন ধরে রাখার সম্ভাবনা বিবেচনা করছে পেট্রোবাংলা।

এ ছাড়া বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রের চুক্তির মেয়াদ ২০৩৪ সালের পর আরও ১৫ বছর বাড়িয়ে ২০৪৯ সাল পর্যন্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে শেভরনের প্রস্তাবে বাপেক্সকে ১০ শতাংশ লাভের অংশীদার করার কথা থাকলেও পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট কমিটি তা বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করার সুপারিশ বিবেচনা করছে।

ডব্লিউপিপিএফ তহবিল নিয়েও জটিলতা

শেভরনের প্রস্তাবে কর্মচারীদের কল্যাণ তহবিল বা ডব্লিউপিপিএফের অর্থ বিনিয়োগ ব্যয় পুনরুদ্ধার তহবিল থেকে পরিশোধের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ নিয়ে পেট্রোবাংলা ও শেভরনের মধ্যে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। পাশাপাশি শ্রমিকদের কল্যাণ তহবিলসংক্রান্ত বিষয়েও বাংলাদেশের শ্রম আদালতে একাধিক মামলা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কমিটির মতে, এ বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

শেভরনের দাবি, নতুন করে অনুসন্ধানের সুযোগ পেলে দেশের গ্যাস উৎপাদন বাড়বে এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে। প্রতিষ্ঠানটির হিসাব অনুযায়ী, ২০৩৫ সাল নাগাদ এলএনজি আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০২৩ সাল থেকেই বাংলাদেশের গ্যাস খাতে নতুন বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়ে আসছে শেভরন। দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি খাতসংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর এ বিষয়ে আলোচনা আরও জোরদার হয়।

তবে ১১ ও ১২ নম্বর ব্লক নিয়ে শেভরনের প্রস্তাবের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট কমিটির প্রতিবেদন চূড়ান্ত হওয়ার পর এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।