একসময় ষষ্ঠ শ্রেণির পর থেমে যায় পড়াশোনা। সামনে ছিল পরিবারের দায়িত্ব, আর জীবনে এগিয়ে যাওয়ার পথ ছিল অনিশ্চিত। কিন্তু থেমে যায়নি স্বপ্ন। সুযোগ আসে দক্ষতা অর্জনের, আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বদলে যেতে শুরু করে ভোলার তরুণ মোঃ আরিফের জীবন। অন্যের প্রতিষ্ঠানে কাজ শেখা থেকে শুরু করে এখন তিনি নিজের ব্যবসার মালিক। তাঁর মাসিক আয় ১০ হাজারেরও বেশি টাকা। এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে প্রশিক্ষণ, আর্থিক সহায়তা আর নিজের পায়ে দাঁড়ানোর এক নিরন্তর চেষ্টা।

ভোলা সদর উপজেলার ভেদুরিয়া ইউনিয়নের ব্যাংকের হাট বাজারসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা আরিফ। বাবা মোঃ মানছুর পেশায় দিনমজুর। বাবা-মা ও আরিফ—তিন সদস্যের এই পরিবারে তিনিই ছিলেন পরিবারের একমাত্র অবলম্বন। আর্থিক বাস্তবতায় ষষ্ঠ শ্রেণির পর আর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু জীবিকার প্রয়োজনে কাজ শেখা এবং নিজের আয়ে পরিবারকে সহযোগিতা করার তাগিদ ছিল তাঁর।

ঠিক এমন সময় নতুন সম্ভাবনার খবর পান আরিফ। তাঁর বাবা গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থার একজন সদস্য। সংস্থার মাঠকর্মীর মাধ্যমে আরিফ জানতে পারেন পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন—পিকেএসএফ ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে, গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থার বাস্তবায়নাধীন রেইজ প্রকল্পের শিক্ষানবিশি কার্যক্রম সম্পর্কে।

এটি ছিল শুধু কাজ শেখার সুযোগ নয়, বরং দক্ষতা অর্জন করে স্বাবলম্বী হওয়ার একটি পথ। বিভিন্ন ট্রেডে ছয় মাসের প্রশিক্ষণ, কোনো প্রশিক্ষণ ফি নেই, বরং শিক্ষানবিশদের জন্য ছয় মাসে ২১ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা। এর পাশাপাশি রয়েছে পাঁচ দিনের জীবন দক্ষতা উন্নয়নবিষয়ক প্রশিক্ষণ, যার জন্য দেওয়া হয় ৭৫০ টাকা যাতায়াত ভাতা।

সুযোগটির বিস্তারিত জেনে আর অপেক্ষা করেননি আরিফ। বিভিন্ন ট্রেডের মধ্যে নিজের পছন্দ হিসেবে বেছে নেন মোবাইল ফোন সার্ভিসিং। জন্মনিবন্ধনের ফটোকপি, পারিবারিক আয়ের সনদ ও পঞ্চম শ্রেণি পাসের সনদসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে ভর্তি হন শিক্ষানবিশি কার্যক্রমে। ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর শুরু হয় তাঁর নতুন পথচলা।

আরিফের প্রশিক্ষক ছিলেন মাস্টার ক্রাফটসপার্সন মোঃ মনির। তাঁর উদ্যোগের নাম মনির টেলিকম। এখানেই শুরু হয় আরিফের হাতে-কলমে কাজ শেখা। প্রতিটি কাজ শুরুতে সহজ ছিল না। ভুল হয়েছে, কাজ করতে গিয়ে বাধার মুখেও পড়েছেন। তবে প্রশিক্ষকের আন্তরিক সহযোগিতা তাঁকে আবার চেষ্টা করার সাহস জুগিয়েছে। ধীরে ধীরে মোবাইল ফোন সার্ভিসিংয়ের কাজে দক্ষ হয়ে ওঠেন তিনি।

এই প্রশিক্ষণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল জীবন দক্ষতা উন্নয়ন। আরিফের কাছে পাঁচ দিনের এই প্রশিক্ষণ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা। কারিগরি কাজ শেখার পাশাপাশি জীবনকে নতুনভাবে দেখার সুযোগও পান তিনি। কারণ, পেশাগত দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি আত্মবিশ্বাস ও নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতিও গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৪ সালের ৩০ মে শেষ হয় আরিফের শিক্ষানবিশি কার্যক্রম। ছয় মাসের প্রশিক্ষণ শেষে এবার তাঁর সামনে নতুন প্রশ্ন—অর্জিত দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে নিজের আয়ের ব্যবস্থা করবেন? কাজ শেখার অভিজ্ঞতাকে এবার বাস্তব উদ্যোগে রূপ দেওয়ার পালা।

সেই লক্ষ্যেই গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থার কাছ থেকে শিক্ষানবিশদের খাত থেকে এক লাখ টাকা ঋণ নেন আরিফ। এই অর্থ দিয়ে গড়ে তোলেন নিজের মোবাইল সার্ভিসিংয়ের দোকান—মেসার্স আরিফ টেলিকম। যে তরুণ একসময় অন্যের প্রতিষ্ঠানে কাজ শিখতেন, তিনিই এবার নিজের উদ্যোগে ব্যবসা শুরু করেন।

বর্তমানে এই ব্যবসা থেকে আরিফের মাসিক আয় ১০ হাজার টাকা। তাঁর কাছে এই আয় শুধু অর্থ উপার্জনের হিসাব নয়; এটি নিজের দক্ষতার ওপর দাঁড়ানোর বাস্তব অভিজ্ঞতা। পরিবারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগও তৈরি হয়েছে তাঁর সামনে। আল্লাহর অশেষ রহমতে এখন পরিবারের সবাইকে নিয়ে ভালো আছেন বলে জানান আরিফ। এই পরিবর্তনের জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ), বিশ্বব্যাংক, রেইজ প্রকল্প এবং গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থার প্রতি।

আরিফের গল্পে বড় কোনো রাতারাতি সাফল্যের দাবি নেই। আছে জীবনের বাস্তবতা, দক্ষতা অর্জনের সুযোগ এবং সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। তাঁর যাত্রা মনে করিয়ে দেয়, আর্থিক সীমাবদ্ধতা অনেক সময় শিক্ষার পথ থামিয়ে দিতে পারে, কিন্তু উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও সহায়তা নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে।

একসময় যে তরুণের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ ছিল সীমিত, আজ সেই তরুণ নিজের দক্ষতায় উপার্জন করছেন, নিজের ব্যবসা পরিচালনা করছেন। আরিফের এই পরিবর্তন শুধু একটি দোকান প্রতিষ্ঠার গল্প নয়; এটি এমন এক সম্ভাবনার গল্প, যেখানে সঠিক সময়ে পাওয়া একটি সুযোগ বদলে দিতে পারে জীবনের গতিপথ।