বাংলাদেশের রাজনীতি আবারও এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে যে রাজনৈতিক পরিবর্তন, সংস্কার ও গণতান্ত্রিক প্রত্যাশার জন্ম হয়েছিল, তার বাস্তবায়ন নিয়ে এখন নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার রাজনৈতিক দূরত্ব এবং আওয়ামী লীগকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি আঁতাতের অভিযোগ দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে নতুন বিতর্কের মুখে ফেলেছে।

একসময় আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনে বিএনপি ও জামায়াত ছিল ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্র। চারদলীয় জোট, বিশদলীয় জোট এবং বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে দুই দলকে একসঙ্গে দেখা গেছে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে রাজনৈতিক অবস্থান বদলেছে। বিএনপি এখন রাষ্ট্রক্ষমতায়, জামায়াত বিরোধী দলে। আর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে সীমাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। এই নতুন বাস্তবতায় দুই দলের মধ্যে মতপার্থক্য ও পারস্পরিক অবিশ্বাস ক্রমেই প্রকাশ্য হচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রশ্নে আলোচনার পরিবর্তে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখন পরস্পরকে সন্দেহ ও দোষারোপের প্রবণতা বাড়ছে।

বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে, সরকারকে অস্থিতিশীল করতে জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের গোপন সমঝোতা রয়েছে। অন্যদিকে জামায়াত এই অভিযোগ অস্বীকার করে বিএনপির বিরুদ্ধেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার পাল্টা অভিযোগ তুলছে। আওয়ামী লীগও দুই দলের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতার কথা অস্বীকার করেছে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এসব অভিযোগের পক্ষে যাচাইযোগ্য প্রমাণ কোথায়? গোয়েন্দা তথ্যের কথা বলা হলে সেই তথ্যের ভিত্তি কী, তার স্বচ্ছ ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন। একইভাবে কোনো রাজনৈতিক দলকে অভিযুক্ত করলেই সেই অভিযোগ সত্য হয়ে যায় না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তথ্য, প্রমাণ এবং জবাবদিহি।

এই বিরোধের গভীরে রয়েছে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কারের প্রশ্ন। জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংস্কার আনার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, জুলাই সনদ তারই একটি রাজনৈতিক ভিত্তি। বিএনপি ও জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এই সনদে স্বাক্ষর করলেও এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে এখন মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।

গণভোটে অনুমোদিত জুলাই সনদের বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংস্কারের প্রক্রিয়া নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের অবস্থানের পার্থক্য এখন স্পষ্ট। বিএনপি সংসদীয় প্রক্রিয়ায় সংবিধান সংশোধনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলো জুলাই সনদের প্রস্তাবিত কাঠামো অনুসারে সংস্কার বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছে। এ নিয়ে সংসদীয় বিশেষ কমিটি গঠন এবং বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিয়েও মতবিরোধ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরির প্রয়োজনীয়তা এখন আরও বেশি।

বিএনপির জন্য দায়িত্বশীলতার জায়গাটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে সংসদীয় আলোচনা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কার্যকর ভূমিকা রাখার। সরকারকে বিরোধী মতের গুরুত্ব দিতে হবে। আবার বিরোধী দলকেও রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে এমন পর্যায়ে নেওয়া উচিত নয়, যাতে রাষ্ট্র পরিচালনা ও প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়।

আওয়ামী লীগকে ঘিরে বর্তমান রাজনৈতিক বিতর্কও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার বিষয়টি যেমন আইনি বাস্তবতা, তেমনি রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিচারও হতে হবে আইন ও প্রমাণের ভিত্তিতে। কোনো রাজনৈতিক শক্তির প্রত্যাবর্তন, নিষেধাজ্ঞা কিংবা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে আবেগের পরিবর্তে সাংবিধানিক ও আইনি প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দিতে হবে।

বিএনপি ও জামায়াতের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের কারণে আওয়ামী লীগ আবার রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসছে। অথচ দেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল, রাজনৈতিক দলগুলো অতীতের সংঘাত ও দোষারোপের রাজনীতি পেছনে ফেলে কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কারে মনোযোগ দেবে।

এখন সময় এসেছে রাজনৈতিক দলগুলোর আত্মসমালোচনার। ক্ষমতাসীন দলকে মনে রাখতে হবে, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেই সব সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক ঐকমত্যের প্রয়োজন শেষ হয়ে যায় না। একইভাবে বিরোধী দলকেও বুঝতে হবে, শুধু আন্দোলন ও বিরোধিতার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সংস্কারের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের রাজনীতি কোনো দলের একক সম্পত্তি নয়। রাষ্ট্রের মালিক জনগণ। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতার দ্বন্দ্বের চেয়ে জনগণের অধিকার, গণতন্ত্রের সুরক্ষা এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে কে আঁতাত করছে, কে কাকে রাজনৈতিকভাবে চাপে রাখছে এসব বিতর্কের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, জনগণের কাছে যে সংস্কার ও গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার বাস্তবায়ন কতটা হচ্ছে?

দেশের মানুষ আরেকটি সংঘাতমুখর রাজনৈতিক অধ্যায় দেখতে চায় না। তারা চায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং আইনের শাসন। বিএনপি, জামায়াতসহ সব রাজনৈতিক শক্তির কাছে এখন সময়ের দাবি পারস্পরিক সন্দেহ ও দোষারোপের রাজনীতি পরিহার করে জাতীয় স্বার্থে সংলাপ ও সমঝোতার পথ তৈরি করা।

রাজনীতির জয় যেন কোনো দলের জয় না হয়ে জনগণের জয় হয় এটাই হওয়া উচিত নতুন বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক অঙ্গীকার।


মামুনুর রশিদ খাঁন: সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত), দুরবীন নিউজ ।