সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর গোপন তৎপরতায় যুক্ত থাকার অভিযোগে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সাত শিক্ষকের বিরুদ্ধে গঠিত তথ্য অনুসন্ধান কমিটির প্রতিবেদন প্রায় দুই মাসেও জমা হয়নি। গত ৬ আগস্ট পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হলেও ৩ অক্টোবর পর্যন্ত অনুসন্ধানের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ বা জমা দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে কমিটির আহ্বায়ক জানিয়েছেন, অনুসন্ধানের কাজ চলছে। এ বিষয়ে একাধিক সভা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাই শেষে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেশের ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ জন শিক্ষককে নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বেরোবির শিক্ষকদের বিষয়ে তথ্য যাচাই করতে এই কমিটি গঠন করা হয়। প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব শিক্ষক শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রেখে একটি টেলিগ্রাম গ্রুপের মাধ্যমে তৎপরতা চালাচ্ছেন বলে দাবি করা হয়েছিল। তবে ওই দাবির সত্যতা এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুসন্ধান কমিটি যাচাই করছে।
গত ৬ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. মো. ফেরদৌস রহমান স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। এতে আহ্বায়ক করা হয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. তানজিউল ইসলাম জীবনকে। সদস্য সচিব লিগ্যাল সেলের সহকারী রেজিস্ট্রার রেহেনা আক্তার মনি। সদস্য হিসেবে রয়েছেন ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. মনিরুজ্জামান, রসায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. হারুন-আল-রশীদ এবং ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আতাউর রহমান।
অনুসন্ধানের আওতায় থাকা সাত শিক্ষকের মধ্যে রয়েছেন লোকপ্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডল, গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মশিউর রহমান, অধ্যাপক ড. আয়েশা আকতার আঁখি ও অধ্যাপক ড. মো. জাকির হোসেন। এ ছাড়া প্রকাশিত প্রতিবেদনে জেড উদ্দিন, দেবু পিকে ও এসকে বি নামে তিনজনের উল্লেখ ছিল। তাঁদের প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করার বিষয়টিও অনুসন্ধানের অংশ।
কমিটির আহ্বায়ক ড. মো. তানজিউল ইসলাম জীবন বলেন, "আমরা তদন্তের কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। এ বিষয়ে কমিটির একাধিক সভা হয়েছে। প্রকাশ্যে আসা শিক্ষকদের বিষয়ে অনেক তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তিনজনের পরিচয় সাংকেতিক হওয়ায় তাঁদের শনাক্ত করতে সময় লাগছে। প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাই শেষে শিগগিরই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।"
এদিকে অনুসন্ধান প্রতিবেদন প্রকাশে বিলম্ব হওয়ায় শিক্ষার্থী ও ছাত্র সংগঠনের নেতাদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বেরোবিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মো. শামসুর রহমান সুমন বলেন, অভিযোগগুলোর বিষয়ে দ্রুত তথ্য যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা সামনে আনা প্রয়োজন। কমিটি গঠনের পর প্রায় দুই মাস পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তিনি দ্রুত অনুসন্ধান শেষ করে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রতিবেদন প্রকাশের দাবি জানান।
বেরোবি শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল ইমরান খান সৌরভ বলেন, অনুসন্ধান কার্যক্রমে দীর্ঘসূত্রতা প্রশাসনের ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। অভিযোগের বিষয়ে দ্রুত অনুসন্ধান শেষ করে প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে বিষয়টির সুরাহা করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
অন্যদিকে বেরোবি শাখা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি মো. রাফায়েল ইমতিয়াজ ইয়ামিন বলেন, শুধু সাত শিক্ষক নয়, অভিযোগের সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত কি না, সেটিও অনুসন্ধানের আওতায় আনা উচিত। তিনি দ্রুত অনুসন্ধান প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী কর্তৃপক্ষ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি জানান।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কমিটি গঠনের সময় জানিয়েছিল, ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজন হলে আনুষ্ঠানিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। এরপর তদন্তের ফল অনুযায়ী শৃঙ্খলা কমিটি ও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। তবে প্রায় দুই মাসেও অনুসন্ধান প্রতিবেদন না আসায় অভিযোগগুলোর সত্যতা এবং পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এখন কমিটির তথ্য-প্রমাণভিত্তিক প্রতিবেদনের ওপরই নির্ভর করছে পরবর্তী প্রক্রিয়া।










