নাফীজ আহমেদ, ইবিঃ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটির (আইইউডিএস) সভাপতি ইয়াছিন আলীর বিরুদ্ধে সংগঠনের প্রায় ১৮ হাজার টাকা আত্মসাৎ, তথ্য গোপন করে বৃত্তি গ্রহণ, রাজনৈতিক ট্যাগিং, সদস্যদের হয়রানি এবং সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি লালন শাহ হল ডিবেটিং সোসাইটির কমিটি গঠনেও তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সামনে এসেছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগের পর ওই কমিটি স্থগিত করেছে হল প্রশাসন। তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইয়াছিন আলী।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত ২০ সেপ্টেম্বর শিক্ষার্থীদের অভিযোগের পর লালন শাহ হল ডিবেটিং সোসাইটির সদ্য ঘোষিত কমিটি স্থগিত করেন হলটির প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক। কমিটির সভাপতি মোহাইমিনুল ইসলাম রক্তিমের বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং যোগ্যদের মূল্যায়ন না করার অভিযোগ ওঠে। একইসঙ্গে কমিটি গঠনে আইইউডিএস সভাপতি ইয়াছিন আলীর সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও সামনে আসে।
তবে ইয়াছিনের দাবি, হল ডিবেটিং সোসাইটির কমিটি হলের সাবেক দায়িত্বশীল ও প্রভোস্টের অনুমোদনেই গঠিত হয়েছিল। এ বিষয়ে প্রভোস্ট জানান, আইইউডিএস সভাপতি ইয়াছিন আলী কমিটিকে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন। তাড়াহুড়ো করে তার কাছ থেকে অনুমোদন নেওয়া হলেও পরে শিক্ষার্থীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কমিটি স্থগিত করা হয়।
এর আগে গত ১২ জুলাই ইয়াছিন আলীর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেন সংগঠনটির প্রতিনিধি মিশুক শাহরিয়ার। অভিযোগে তিনি দাবি করেন, ব্যক্তিগত আক্রোশ ও রাজনৈতিক ট্যাগিংয়ের কারণে তাকে আইইউডিএসের কমিটিতে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি এবং বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়েছে।
মিশুকের অভিযোগ, আইইউডিএস নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পর তাকে ‘শিবির’ ট্যাগ দিয়ে কমিটিতে না রাখার কথা বলা হয়। একইসঙ্গে জুনিয়র সদস্য ও হল প্রভোস্টের কাছে তার বিষয়ে ভুল বা অসত্য তথ্য দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি। তার দাবি, কমিটি গঠনের সময় উপদেষ্টা পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুসরণ করা হয়নি। সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী হওয়া সত্ত্বেও তাকে কমিটিতে রাখা হয়নি; বিপরীতে হল কমিটির আনুষ্ঠানিক সদস্য নন—এমন একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এদিকে আইইউডিএসের মডারেটরের কাছে দেওয়া আরেক লিখিত অভিযোগে সংগঠনটির এডুকেশন অ্যান্ড পাবলিকেশন সেক্রেটারি এবং সাদ্দাম হোসেন হল ডিবেটিং সোসাইটির সভাপতি মো. শান্ত শিশিরও ইয়াছিন আলীর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তুলেছেন।
অভিযোগে বলা হয়, সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এক্সিকিউটিভ কমিটি ও হল ডিবেটিং সোসাইটিগুলোর সঙ্গে আলোচনা না করে বিতার্কিকদের জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় পাঠানো, বিভিন্ন ব্যক্তিকে রাজনৈতিক ট্যাগ দিয়ে হয়রানি, মেধাবী বিতার্কিকদের সাংগঠনিক কার্যক্রম থেকে দূরে রাখা এবং হলগুলোর সঙ্গে সমন্বয়হীনতার অভিযোগও করা হয়। একই অভিযোগে আইইউডিএসের প্রায় ১৮ হাজার টাকা আত্মসাতের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
মিশুক শাহরিয়ার বলেন, ইয়াছিন আলী মোরাল প্যারেন্টিং ট্রাস্ট থেকে নিজের তথ্য গোপন করে নিয়মিত বৃত্তি নিতেন। সংগঠনটির প্রতিনিধি হিসেবে বিষয়টি কেন্দ্রীয় পর্যায়ে জানানোর পর তাকে একাধিকবার রুমে ডেকে মানসিকভাবে হয়রানি করা হয় এবং রাজনৈতিক ট্যাগ দিয়ে আইইউডিএসের কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হয়। এমনকি লালন শাহ হল ডিবেটিং সোসাইটির স্থগিত কমিটিতেও তাকে মূল্যায়ন করা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে ইয়াছিন আলী বলেন, আইইউডিএসের আন্তঃবিভাগীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতার ১৮ হাজার টাকা তাদের ট্রেজারারের কাছে রয়েছে। ফলে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ সঠিক নয়। মোরাল প্যারেন্টিং ট্রাস্টের বৃত্তির বিষয়ে তিনি বলেন, ২০২২ সাল থেকে তিনি বৃত্তি পেয়ে আসছেন। তার মাস্টার্স এখনো শেষ না হওয়ায় সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে মাস্টার্স শেষ হওয়া পর্যন্ত বৃত্তি চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এখানে তথ্য গোপনের কোনো বিষয় নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
লালন শাহ হলের কমিটির বিষয়ে ইয়াছিন বলেন, তিনি ওই কমিটিকে শুভেচ্ছা জানাননি এবং কমিটি গঠন সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট সভাপতির মতামতের ভিত্তিতে হয়েছে। ট্যাগিংয়ের অভিযোগও মিথ্যা দাবি করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আগের মডারেটরের সঙ্গে সংগঠনের বডির বৈঠক হয়েছিল এবং অভিযোগগুলো মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় এ নিয়ে প্রেস রিলিজও দেওয়া হয়েছিল।
জাতীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতায় দল পাঠানোর বিষয়ে ইয়াছিন বলেন, সেক্রেটারিয়েটের সিনিয়র সদস্যরা আলোচনা করেই যোগ্য বিতার্কিকদের নির্বাচন করেন।
এদিকে মোরাল প্যারেন্টিংয়ের ক্যাম্পাস গার্ডিয়ান ও ফোকলোর স্টাডিজ বিভাগের লেকচারার ফয়াসাল হোসেন বলেন, তথ্য গোপন করে বৃত্তি নেওয়ার বিষয়টি তারা কিছুদিন আগে জানতে পারেন। পরে বিষয়টি নির্বাহী সদস্যদের জানানো হলে ইয়াছিন তাদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি সমাধান করেন।
আইইউডিএসের বর্তমান মডারেটর লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জুলফিকার হোসেন বলেন, তিনি নতুন দায়িত্ব নিয়েছেন এবং উত্থাপিত বিষয়গুলো খতিয়ে দেখবেন। তার দায়িত্ব নেওয়ার আগে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটির কোনো বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছিল না। তিনি বর্তমানে সংগঠনের নামে একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলেছেন।
তিনি বলেন, এখন থেকে সংগঠনের সব টাকা ওই অ্যাকাউন্টে জমা হবে, যাতে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা থাকে। ব্যক্তিগত কোনো অভিযোগ থাকলেও তা খতিয়ে দেখা হবে। ডিবেটিং সোসাইটিকে তার উদ্দেশ্য অনুযায়ী কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে প্রয়োজনে নতুন করে অর্ডিন্যান্স তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে।










