বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শ্রমবাজার সৌদি আরব। দেশটি থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স আসে। তবে এর বিপরীতে বাংলাদেশি কর্মীদের নির্যাতন, শোষণ, রহস্যজনক মৃত্যু এবং আইনি জটিলতার অভিযোগও বারবার সামনে আসছে। সম্প্রতি সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স পেয়েছে সৌদি আরব থেকে। এ সময়ে দেশটি থেকে এসেছে ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্সের ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ এসেছে সৌদি আরব থেকে।
তবে রেমিট্যান্সের এই প্রবাহের আড়ালে দেশটিতে বাংলাদেশি কর্মীদের নানা ধরনের নির্যাতন ও শোষণের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে দুই বাংলাদেশি নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা এবং এ বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকার বিষয়টি উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
সৌদিতে নারী কর্মীদের শোষণ ও নির্যাতনের অভিযোগ
সৌদি আরবে বাংলাদেশি শ্রমিকদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ শুধু শারীরিক নিপীড়নে সীমাবদ্ধ নয়। কর্মক্ষেত্রে শোষণ, বেতন আটকে রাখা, অতিরিক্ত সময় কাজ করানো, খাবার না দেওয়া, পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া, নিয়োগকর্তার হুমকি এবং আইনি প্রতিকার পেতে জটিলতার মতো অভিযোগও রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন নারী কর্মীরা। মানবাধিকারকর্মী ও অভিবাসী অধিকার বিশেষজ্ঞ এম রায়হান কবিরের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফেরা এক নারী সন্তান কোলে নিয়ে জানিয়েছিলেন, তিনি জানেন না তার সন্তানের বাবা কে। নিয়োগকর্তা, নিয়োগকর্তার ছেলে, বন্ধু নাকি গাড়িচালক—কার দ্বারা তিনি নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, তা নিশ্চিত করতে পারেননি ওই নারী। এ ধরনের ঘটনা প্রায়ই ঘটছে বলে দাবি করেন তিনি।
ব্র্যাকের অভিবাসন বিভাগের প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, সৌদি আরব থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে শত শত নারী দেশে ফিরছেন। অনেকে ফিরছেন মরদেহ হয়ে। কিন্তু এসব ঘটনার কারণ অনুসন্ধান, তদন্ত, দায় নির্ধারণ এবং প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের মতো দেশ নারী কর্মীদের নিরাপত্তার প্রশ্নে সৌদি আরবে কর্মী পাঠানো বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ ও কঠোর অবস্থান প্রয়োজন। তার দাবি, গত এক দশকে শারীরিক ও যৌন নির্যাতনসহ বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হয়ে ১০ হাজার নারী দেশে ফিরেছেন।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছেন। তাদের একটি অংশ নিপীড়নের শিকার। একই সময়ে বিদেশ থেকে নারী কর্মীদের অন্তত ৮০০ মরদেহ দেশে এসেছে।
প্রবাসীদের নিরাপত্তায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে সৌদি আরবে প্রায় দুই হাজার কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে সাত লাখ ৫০ হাজারের বেশি কর্মী পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে দেশটিতে আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৫ লাখ বাংলাদেশি বসবাস করছেন।
এত বড় শ্রমবাজার ও বিপুলসংখ্যক প্রবাসী কর্মীর বিপরীতে তাদের সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ, দূতাবাসের জনবল, সক্ষমতা এবং জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সাংবাদিক মাসুদ কামাল বলেন, প্রবাসী শ্রমিকেরা কষ্টার্জিত অর্থ দেশে পাঠিয়ে অর্থনীতিকে সচল রাখেন। অথচ তাদের অনেককে দূতাবাসে গিয়ে অসহযোগিতা ও দুর্ব্যবহারের মুখোমুখি হতে হয়। কূটনৈতিক প্রতিনিধিত্বে দক্ষ জনবল থাকলেও সাধারণ শ্রমিকদের সমস্যা সমাধানে সেই দক্ষতার যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও যারা এই অর্থ পাঠান, তাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বিদেশে কোনো কর্মী বিচার বা শাস্তির মুখোমুখি হলে তার আইনি অধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে শ্রমবাজারের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি প্রবাসীদের জীবন ও নিরাপত্তাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রবাসীদের সুরক্ষায় দূতাবাসের কার্যকর ভূমিকার তাগিদ
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিদেশে বিপদে পড়ার পর কেবল কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করলেই হবে না। প্রবাসীদের জন্য আগে থেকেই কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। কর্মীদের বিদেশে যাওয়ার আগে সচেতনতা বৃদ্ধি, নিয়োগপ্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ, নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত এবং আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার মতো উদ্যোগ আরও জোরদার করা দরকার।
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা তাই শুধু দুটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি বাংলাদেশের অভিবাসন ব্যবস্থাপনা, কূটনৈতিক সক্ষমতা এবং বিদেশে কর্মরত নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের প্রস্তুতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু রেমিট্যান্সের প্রবাহ ধরে রাখা নয়, বরং সেই অর্থ উপার্জনকারী মানুষের জীবন, নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষায়ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোর আন্তরিকতা, জবাবদিহিতা এবং দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।







