মোঃ বিল ইয়ানূর তালুকদার, নিজস্ব প্রতিবেদকঃ


সরকারি খাতায় তিনি স্রেফ একজন কানুনগো। পদমর্যাদায় নন-গেজেটেড একজন সাধারণ রাজস্ব কর্মকর্তা। কিন্তু পর্দার আড়ালে তার প্রভাব আর সম্পদের বহর হার মানায় বাঘা বাঘা ধনকুবেরদেরও। অভিযোগ, টেবিলের নিচ দিয়ে ফাইলে স্বাক্ষর আটকানো আর ছাড়ার খেলায় গড়ে তুলেছেন অনিয়ম আর দুর্নীতির সাম্রাজ্য। ঢাকার অন্যতম অভিজাত এলাকা গুলশান থেকে শুরু করে নারায়ণগঞ্জ, যেদিকেই চোখ যায়, শুধুই তাঁরই নামে-বেনামে বিস্তির্ণ সম্পদ।


তিনি তেজগাঁও রাজস্ব সার্কেলের সাবেক কানুনগো খলিলুর রহমান। একইসঙ্গে বাগিয়ে নিয়েছেন ‘বাংলাদেশ কানুনগো কল্যাণ সমিতি’র সভাপতির পদটিও।


অভিযোগের পাহাড় ঘেঁটে বেরিয়ে এসেছে গা শিউরে ওঠার মতো তথ্য, সরকারি দায়িত্বের আড়ালে তিনি নিজেই খুলে বসেছেন আস্ত ‘ভূমি সেবা ফার্ম’ ও একটি নামিদামি কোচিং সেন্টার। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, একজন সরকারি কর্মকর্তার বেতন আর সুযোগ-সুবিধার যোগফল দিয়ে কীভাবে কেনা যায় রাজধানীর বুকে বিঘার পর বিঘা জমি আর একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট? কানুনগো খলিলুরের হাতে আসলে কোন ‘আলাদিনের চেরাগ’?


অনুসন্ধানে জানা গেছে, খলিলুর রহমানের এই কালো সাম্রাজ্যের ভিত গড়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের রক্ত-ঘামে। নামজারির ফাইলে ‘ত্রুটি’র সিল মেরে কৃত্রিম সংকট তৈরি করাই ছিল তার মূল হাতিয়ার। 


বিভিন ভুলত্রুটি দেখিয়ে নানা অজুহাতে তিনি বাতিল করে দিতেন নামজারি। ভুক্তভুগীদের অভিযোগ,একাধিক বার আবেদন করেও কোনো প্রতিকার মেলেনি এসব থেকে। পরে টাকা দিলেই সব সমস্যা সমাধান হয়ে যেত। এভাবেই তিনি ভেতরে ভেতরে ঘুষের সিন্ডিকেট পরিচালনা করে এসেছেন। এই ছিল তার দ্বিমুখী চাল। 


এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে জমিমালিকরা যখন তার দরবারে লাখ লাখ টাকার খাম তুলে দিতেন, তখনই রাতের আঁধারে খুলে যেত সেই ফাইলের গিঁট। 


চোখ কপালে তোলার মতো পাহাড়সম অভিযোগের নথি বলছে,

গুলশান ডুমনী মৌজায় ৪ কাঠা যার জোত নং- ১৩৭/২৫

গুলশান ডুমনী মৌজায় আরও ৪ কাঠা যার জোত নং- ১৪৭/৩৫

ধানমন্ডি রামচন্দ্রপুর মৌজায় একটি ফ্ল্যাট

রমনা খিলগাঁও এলাকায় একটি অভিজাত ফ্ল্যাট

ডেমরা শূন্যা মৌজায় ৬ কাঠা জমি যার জোত নং- ২৩/০২

ডেমরা শূন্যা মৌজায় ৫ কাঠা জমি যার জোত নং- ২৪/০২

ডেমরা শূন্যা মৌজায় ৪ কাঠা যার জোত নং- ২৫/০২

নারায়ণগঞ্জ, রূপগঞ্জ, কাঞ্চন মৌজায় ৩ কাঠা জমি নামে বেনামে হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি।


অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সরাসরি মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয় সেই কানুনগো খলিলুর রহমানের সঙ্গে। কল রিসিভ করেই শুরু করেন চরম নাটকীয়তা।


প্রতিবেদক পরিচয় দেওয়ার পর খলিলুর রহমান প্রথম বাক্যেই নিজের পরিচয় পুরোপুরি অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, তাকে ভুল ফোন দেওয়া হয়েছে।


কিন্তু নাটকের মোড় ঘোরে ঠিক পরের মুহূর্তে। প্রতিবেদক যখন একে একে গুলশান, ধানমন্ডি, ডেমরা ও রূপগঞ্জের নির্দিষ্ট জোত নম্বর ও খতিয়ানের ফিরিস্তি বলতে শুরু করেন, ফোনের অপর প্রান্তে নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। কিছুক্ষণের জন্য রীতিমতো বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন এই প্রতাপশালী কর্মকর্তা।


মুহূর্তের স্তব্ধতা কাটিয়ে এবার স্বর পাল্টান তিনি। তোতলানো গলায় এবার সরাসরি সব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেন, “এগুলোর একটারও মালিক আমি না।” তার দাবি অনুযায়ী বর্তমানে কর্মরত আছেন নারায়ণগঞ্জে। 


তাহলে কোটি কোটি টাকার এই জমি ও ফ্ল্যাটগুলো কার?  প্রশ্নে খলিলুর রহমান মেজাজ হারিয়ে জবাব দেন, “তদন্ত করে বের করে নিন এগুলো কার!”


নামে-বেনামে এই সম্পদের আসল মালিকানা কার, এই সোজা প্রশ্নের মুখোমুখি যেন হতে চাননি তিনি। এবং একপর্যায়ে তড়িঘড়ি করে ফোনের সংযোগ কেটে দেন এই কর্মকর্তা।


তবে প্রশ্ন যেন এখন আরও গভির। তিনি কি একাই এই সম্পদ গড়েছেন? নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও বড় কোন রাঘব-বোয়াল? কিভাবে এত দিনেও কেউ জানতে পারেনি তার কালো টাকার এই পাহাড়ের সন্ধান? আর কিভাবেই বা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন এমন সব দুর্নীতিবাজ  কর্মকর্তারা?