রাজু তালুকদার, মোংলা রামপাল প্রতিনিধি:
সুন্দরবনে মাছ ধরতে গিয়ে বনদস্যুদের হাতে অপহৃত ২১ জেলের ১২ দিনেও সন্ধান মেলেনি। গত ২৫ ও ২৬ সেপ্টেম্বর পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় পৃথক হামলা চালিয়ে তাঁদের অপহরণ করা হয়। একের পর এক দিন পেরিয়ে গেলেও স্বজনদের কাছে ফিরছেন না জেলেরা। প্রতিটি পরিবারে এখন কান্না আর আহাজারি। কখন প্রিয়জন ফিরে আসবেন—এই উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে স্বজনদের।
অপহৃত জেলেদের উদ্ধারে কোস্ট গার্ড ও বন বিভাগ অভিযান চালানোর কথা জানালেও ১২ দিনেও তাঁদের অবস্থান নিশ্চিত করতে পারেনি। দস্যুদের সম্ভাব্য আস্তানা শনাক্তে নৌপথে তল্লাশির পাশাপাশি ড্রোন দিয়ে নজরদারি চালানো হচ্ছে। কিন্তু এত তৎপরতার পরও ২১ জেলের কোনো হদিস না মেলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা ও কার্যকর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করা হয়েছে, এমন দাবি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা বারবার বলা হলেও বাস্তব চিত্র যেন ভিন্ন। জেলে অপহরণের মতো ঘটনায় দিনের পর দিন কেটে গেলেও যদি অপহৃতদের অবস্থান শনাক্ত করা না যায়, তাহলে সুন্দরবনে সাধারণ জেলেদের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত—এ প্রশ্ন এখন জোরালো হয়ে উঠেছে।
বন বিভাগ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ২৫ ও ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে নারকেলবাড়িয়া, আমবারিয়া, ভদ্রা ও ভাঙ্গা এলাকায় মাছ ধরার সময় জেলেদের ওপর হামলা চালানো হয়। এসব ঘটনায় মজনু, করিম শরীফ ও বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর সদস্যরা জেলেদের অপহরণ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় একটি মাছ ধরার ট্রলার, পাঁচটি মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন মালামালও নিয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
অপহরণের পর থেকেই জেলেদের পরিবার ও মহাজনদের মধ্যে উৎকণ্ঠা চরমে উঠেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন মহাজন জানান, জেলেদের মুক্তির জন্য দস্যুদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ ও দর-কষাকষি চলছে। মুক্তিপণ দাবি করা হলেও নিরাপত্তার কারণে তাঁরা এর পরিমাণ প্রকাশ করতে চাননি। টাকা পরিশোধের পর জেলেদের ছেড়ে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তাঁরা।
এদিকে ২১ জেলে অপহরণের ঘটনায় সুন্দরবনে মাছ ধরতে যাওয়া অন্য জেলেদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। জীবিকার তাগিদে বনে যেতে হয়, আবার বনে গেলেই দস্যু আতঙ্ক—এ যেন উপকূলের জেলেদের নিত্যদিনের বাস্তবতা। তাঁদের প্রশ্ন, যদি সুন্দরবনে নিরাপত্তা নিশ্চিতই হয়ে থাকে, তাহলে দিনের পর দিন এতসংখ্যক জেলে অপহৃত হয়ে নিখোঁজ থাকছেন কীভাবে?
জেলেদের অভিযোগ, দস্যু নির্মূল ও সুন্দরবনে নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা সময় নানা আশ্বাস দেওয়া হলেও তার সুফল তাঁরা বাস্তবে পাচ্ছেন না। ফলে সরকারের ঘোষণা ও মাঠের বাস্তবতার মধ্যে বড় ধরনের ফারাক রয়েছে বলেও মনে করছেন তাঁরা।
পূর্ব সুন্দরবনের ডিএফও মো. রেজাউল করিম জানিয়েছেন, অপহৃত জেলেদের উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সুন্দরবনে অবস্থানরত জেলেদের রাতে দলবদ্ধভাবে থাকার এবং বন অফিসের আশপাশে অবস্থানের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বন বিভাগের স্টেশন ও টহল ফাঁড়িগুলোতেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
তবে ১২ দিনেও ২১ জেলের সন্ধান না মেলায় এসব পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে। অপহৃত জেলেদের স্বজনদের দাবি, অভিযান ও আশ্বাস নয়—তাঁরা তাঁদের প্রিয়জনদের জীবিত অবস্থায় ফিরে পেতে চান।
সুন্দরবন দস্যুমুক্ত করার ঘোষণা যদি বাস্তবেই কার্যকর হয়ে থাকে, তাহলে ২১ জেলেকে ১২ দিনেও উদ্ধার করা গেল না কেন—এই প্রশ্নের জবাব এখন প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেই দিতে হবে।









