অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া উপাচার্য ড. কাজী মো. রফিকুল ইসলামকে ঘিরে চলমান বিরোধ, শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ওপর হামলা, মামলা ও গ্রেফতারের ঘটনায় টানা উত্তেজনায় কার্যত অচল হয়ে পড়েছে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (পবিপ্রবি)। টানা আন্দোলন ও ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে বৃহস্পতিবার (১৪ মে) টানা চতুর্থ দিনের মতো প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা। সকাল ৯টা থেকে আন্দোলনকারীরা প্রশাসনিক ভবনের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন এবং হামলার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।

গত কয়েকদিনের আন্দোলন, হামলা ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগকে কেন্দ্র করে পুরো ক্যাম্পাসে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। এতে শিক্ষা কার্যক্রম, প্রশাসনিক কাজ এবং শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক জীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আন্দোলনরত শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শিক্ষকদের ওপর হামলার ঘটনায় ক্যাম্পাসে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, উপাচার্যের পদত্যাগ ছাড়া পরিস্থিতির কোনো সমাধান সম্ভব নয়।

citytouch 728-X-90

আন্দোলনের কারণে ক্লাস-পরীক্ষা কার্যত বন্ধ হয়ে পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

জানা গেছে, গত সোমবার সকালে প্রশাসনিক ভবনের সামনে উপাচার্যের অপসারণ দাবিতে চলমান অবস্থান কর্মসূচিতে হামলার ঘটনা ঘটে। এতে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীসহ প্রায় ৩০ জন আহত হন। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, উপাচার্যের ইন্ধনে বহিরাগত সন্ত্রাসীরা অতর্কিত হামলা চালিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আবুল বাশার খান বলেন, “শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচিতে বহিরাগতদের এনে হামলা চালানো হয়েছে। হামলাকারীদের গ্রেফতার এবং উপাচার্যের পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।”

হামলার ঘটনার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা-কর্মচারী সংগঠন এবং শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ আন্দোলনে যুক্ত হন। পরে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাও কর্মসূচিতে অংশ নেন। বুধবার দুপুরে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা উপাচার্যের কার্যালয়, বাসভবনসহ প্রশাসনিক বিভিন্ন দপ্তরে তালা ঝুলিয়ে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ ঘোষণা করেন। এরপর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনিক অস্থিরতা চলছিল। তবে এবার পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ আকার নিয়েছে। তাদের ভাষ্য, শিক্ষকরা দুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর।

এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা কর্মকর্তা মো. মুকিত বাদী হয়ে দুমকি থানায় ২৬ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন। মামলার পরপরই পুলিশ অভিযান শুরু করে। শিক্ষকদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে বুধবার রাতে দুমকি উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মো. গোলাম কিবরিয়াকে গ্রেফতার করা হয়।

দুমকি থানার ওসি মো. সেলিম উদ্দিন বলেন, “মামলার ভিত্তিতে একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং অন্য আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।”

এদিকে ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে উপজেলা বিএনপি, যুবদল, মহিলা দল, কৃষক দল ও শ্রমিক দলের মোট নয়জন নেতাকর্মীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে একক কর্তৃত্ববাদী প্রশাসন চালানো হচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া ভিসির বিরুদ্ধে নিয়োগ, পদায়ন, টেন্ডার ও উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগও তুলেছেন তারা। তাদের দাবি, এসব অনিয়মের প্রতিবাদ করায় আন্দোলনরত শিক্ষক-কর্মকর্তাদের দমন করতে বহিরাগতদের ব্যবহার করা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে উপাচার্য ড. কাজী মো. রফিকুল ইসলামের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার প্রতিক্রিয়া জানা সম্ভব হয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ড. মো. হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন, বহিরাগত হামলার অভিযোগ তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।