বাংলাদেশে ব্যবহৃত বা পুনঃসংস্কারকৃত বৈদ্যুতিক গাড়ি (EV) আমদানির সুযোগ দেওয়ার দাবি নিয়ে আলোচনা চলছে। কিন্তু এই বিতর্কে একটি মৌলিক বিষয় প্রায়ই আড়ালে থেকে যাচ্ছে—পুরোনো পেট্রোল বা হাইব্রিড গাড়ি এবং পুরোনো বৈদ্যুতিক গাড়ির অর্থনৈতিক হিসাব এক নয়। বৈদ্যুতিক গাড়ির মূল সম্পদগুলোর একটি তার ব্যাটারি; তাই একটি ব্যবহৃত EV আমদানির অর্থ একই সঙ্গে একটি ব্যবহৃত ব্যাটারির অবশিষ্ট আয়ুও কেনা।
প্রথম প্রশ্নটি হওয়া উচিত বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবহার নিয়ে। বাজারে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার বা তার বেশি চলাচল-সক্ষমতার কিছু জাপানি ব্যবহৃত EV-এর মূল্য ৩২ হাজার মার্কিন ডলারের বেশি দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে কাছাকাছি ব্যবহারিক সক্ষমতার কিছু নতুন চীনা EV প্রায় ১৫–১৭ হাজার ডলারের মধ্যে সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে। অবশ্যই সব গাড়িকে একই হিসাবে ফেলা যাবে না, মডেল, ব্যাটারির ধারণক্ষমতা, নিরাপত্তা ও অন্যান্য সুবিধা মিলিয়ে সমমানের গাড়ির তুলনা করতে হবে।
তবু অর্থনৈতিক প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণ হিসেবে, একটি ব্যবহৃত গাড়ির মূল্য ৩২ হাজার এবং সমমানের নতুন গাড়ির মূল্য ১৬ হাজার ডলার হলে প্রতি গাড়িতে পার্থক্য ১৬ হাজার ডলার। ১০ হাজার গাড়ির ক্ষেত্রে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১৬ কোটি মার্কিন ডলার। সীমিত বৈদেশিক মুদ্রার দেশে একই পরিবহন-সুবিধা অর্জনে অতিরিক্ত ডলার ব্যয়ের যৌক্তিকতা তাই রাষ্ট্রকে অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে।
বিশ্ববাজারের পরিবর্তনটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA)-এর ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বের ৮০ শতাংশের বেশি ব্যাটারি সেল, প্রায় ৮৫ শতাংশ ক্যাথোড সক্রিয় উপাদান এবং ৯০ শতাংশের বেশি অ্যানোড সক্রিয় উপাদান চীনে উৎপাদিত হয়েছে। একই সময়ে বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ বৈদ্যুতিক গাড়িও চীনে তৈরি হয়েছে। বিপুল উৎপাদনক্ষমতা ও পূর্ণাঙ্গ সরবরাহশৃঙ্খল নতুন EV-এর উৎপাদন ব্যয় দ্রুত কমিয়ে এনেছে।
এই বাস্তবতায় পুরোনো EV আমদানির অর্থনীতি নতুন করে হিসাব করা প্রয়োজন। কারণ গাড়ির বয়সের পাশাপাশি ব্যাটারির স্বাস্থ্যমান (State of Health বা SoH) কমতে থাকে। ঘোষিত ৪০০ কিলোমিটার চলাচল-সক্ষমতা একটি ব্যবহৃত গাড়িতে বাস্তবে কতটুকু অবশিষ্ট আছে, তা শুধু গাড়ির বয়স বা মাইলেজ দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় না। ব্যাটারির ব্যবহার, চার্জিং ইতিহাস, তাপমাত্রা এবং সেলের অবস্থা গুরুত্বপূর্ণ।
এখানেই রাষ্ট্রের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক ঝুঁকি। পুরোনো ব্যাটারি দ্রুত মেরামত বা পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে গাড়ি আমদানির পর আবার ব্যাটারি ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হবে। অর্থাৎ প্রথমে পুরোনো গাড়ি আমদানিতে ডলার, পরে তার ব্যাটারি ও যন্ত্রাংশে আবার ডলার—দুই পর্যায়ে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
এর সঙ্গে রয়েছে পরিবেশগত ব্যয়। ব্যবহৃত ব্যাটারি তুলনামূলক দ্রুত মেয়াদশেষে পৌঁছালে সেটির সংগ্রহ, পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ ও নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায় বাংলাদেশকেই নিতে হবে। নতুন গাড়ি আমদানিতে যেখানে একটি ব্যাটারির প্রায় সম্পূর্ণ ব্যবহারযোগ্য জীবন পাওয়া যায়, সেখানে পুরোনো EV-এর ক্ষেত্রে তার একটি অংশ আগেই অন্য দেশে ব্যবহৃত হয়ে গেছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক দেশীয় শিল্প। সরকার দেশে বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদন ও সংযোজন উৎসাহিত করছে। ভবিষ্যতে স্থানীয় সংযোজন, যন্ত্রাংশ উৎপাদন, ব্যাটারি সেবা, দক্ষ জনবল এবং প্রযুক্তি স্থানান্তর গড়ে উঠলে দেশে কর্মসংস্থান ও মূল্য সংযোজন বাড়বে। পুরোনো সম্পূর্ণ তৈরি EV-এর বড় বাজার তৈরি হলে নবীন দেশীয় শিল্পের সেই সম্ভাবনাও চাপে পড়তে পারে।
অতএব বিষয়টি জাপান বনাম চীন নয়; পুরোনো প্রযুক্তি বনাম নতুন প্রযুক্তির অর্থনীতি। জাপানি গাড়ির গুণগত মান প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রয়োজন নেই। বরং প্রশ্ন হলো—একই বা কাছাকাছি ব্যবহারিক সক্ষমতায় কম বৈদেশিক মুদ্রায় নতুন ব্যাটারি, আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রস্তুতকারকের ওয়ারেন্টিসহ নতুন গাড়ি পাওয়া গেলে বেশি ডলার দিয়ে ব্যবহৃত ব্যাটারিসহ পুরোনো গাড়ি আমদানির অর্থনৈতিক সুবিধা কোথায়?
তবে নতুন গাড়ির ক্ষেত্রেও সরকারের কঠোর মানদণ্ড প্রয়োজন। ব্যাটারির নিরাপত্তা সনদ, প্রস্তুতকারকের ওয়ারেন্টি, চার্জিং ব্যবস্থা, বিক্রয়োত্তর সেবা, যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং মেয়াদোত্তীর্ণ ব্যাটারি ব্যবস্থাপনার নিশ্চয়তা ছাড়া শুধু ‘নতুন’ পরিচয়ে কোনো EV-কে সুবিধা দেওয়া উচিত নয়।
বাংলাদেশের নীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতি ডলার বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে সর্বোচ্চ প্রযুক্তি, দীর্ঘতম ব্যবহারযোগ্য আয়ু, সর্বনিম্ন ভবিষ্যৎ দায় এবং সর্বোচ্চ দেশীয় মূল্য সংযোজন নিশ্চিত করা।
সুতরাং ব্যবহৃত EV আমদানির প্রশ্নটি কেবল গাড়ি ব্যবসার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে চলবে না। এটি একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা, ভোক্তার দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়, পরিবেশ এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বৈদ্যুতিক গাড়ি শিল্পের প্রশ্ন।









