সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথিরা। একই সঙ্গে দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খামিস মুশাইতে অবস্থিত কিং খালিদ বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলার কথাও জানিয়েছে গোষ্ঠীটি। তবে এসব হামলার সাফল্য সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জানিয়েছে, রিয়াদ অভিমুখে ছোড়া হুথিদের একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই প্রতিহত করা হয়েছে। জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ তথ্য জানান।
সাম্প্রতিক হামলার পর সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। দেশটির বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলার ঘটনায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। তবে হামলার আগাম সতর্কতা ও প্রতিরোধব্যবস্থা নিয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের তদন্তের বিস্তারিত এখনো স্পষ্ট নয়।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে হুথিদের এই তৎপরতা আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। বিশেষ করে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ঘিরে সংঘাত বিস্তৃত হলে সৌদি আরবের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হুথিরা কারা?
হুথিরা ইয়েমেনের একটি রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামরিক আন্দোলন। গোষ্ঠীটির আনুষ্ঠানিক নাম ‘আনসার আল্লাহ’। প্রতিষ্ঠাতা নেতা হুসেইন বদরুদ্দিন আল-হুথির নাম অনুসারে তারা ‘হুথি আন্দোলন’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
১৯৯০-এর দশকে ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে জায়েদি শিয়া সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পুনর্জাগরণ আন্দোলন হিসেবে তাদের উত্থান ঘটে। একসময় এই সম্প্রদায় ইয়েমেনের একটি বড় অংশ শাসন করলেও পরবর্তী সময়ে তাদের ঐতিহাসিক আবাসভূমি অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ে এবং রাজনৈতিক প্রভাব কমে যায়।
শুরুতে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সঙ্গে একাধিক সংঘর্ষে জড়ায় হুথিরা। প্রতিবেশী সৌদি আরবের সঙ্গেও তাদের সীমান্ত সংঘাত হয়।
২০১১ সালে আরব বসন্তের গণবিক্ষোভের পর ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহ ক্ষমতাচ্যুত হন। এরপর দেশটির রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে উত্তরাঞ্চলে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করে হুথিরা। ২০১৪ সালে তারা রাজধানী সানা দখল করে। এর ফলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার দক্ষিণাঞ্চলের এডেনে সরে যেতে বাধ্য হয়।
বর্তমানে ইয়েমেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশ হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। দেশটির দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধে তারা অন্যতম প্রধান পক্ষ।
সৌদি আরবের সঙ্গে সংঘাতের সূত্রপাত যেভাবে
ইয়েমেনে হুথিদের প্রভাব বৃদ্ধি এবং ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক সৌদি আরবের উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে ওঠে। ২০১৫ সালে হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকানো এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে পুনর্বহালের লক্ষ্যে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ইয়েমেনে অভিযান শুরু করে।
কিন্তু এই সামরিক হস্তক্ষেপ দেশটির গৃহযুদ্ধকে আরও দীর্ঘায়িত করে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ জোটের বিভিন্ন দেশের বিমান হামলা এবং বিভিন্ন পক্ষের সংঘর্ষে ইয়েমেনে ভয়াবহ মানবিক সংকট দেখা দেয়।
ইয়েমেনের দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ড এবং হুথিদের শক্ত অবস্থানের কারণে কোনো পক্ষই পুরো দেশটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। হুথিরা উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে এবং সময়ের সঙ্গে নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়ায়।
একপর্যায়ে সৌদি আরবের তেল স্থাপনা, বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালাতে শুরু করে গোষ্ঠীটি। দীর্ঘ সংঘাতের পর ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা পুরোপুরি শেষ হয়নি।
লোহিত সাগরে হামলা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
২০২৩ সালের নভেম্বরে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের প্রতিবাদ এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থনের কথা জানিয়ে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুরু করে হুথিরা। একই সময়ে ইসরায়েল লক্ষ্য করেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় তারা।
লোহিত সাগর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এর দক্ষিণ প্রান্তে রয়েছে বাব আল-মানদেব প্রণালি, যা লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এই পথ দিয়ে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহন করা হয়।
এ পথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে অনেক জাহাজকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। এতে পরিবহন ব্যয় ও সময় বেড়ে যায় এবং বিশ্ববাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে চাপ সৃষ্টি হয়।
ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক সংঘাত বাড়লে হুথিদের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সৌদি আরবের জন্যও লোহিত সাগরের বন্দর ও সমুদ্রপথের নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে যখন অন্য নৌপথে চলাচল বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
বিশ্বের জ্বালানি বাজারে সৌদি আরবের গুরুত্ব
সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশ। দেশটির অর্থনীতি ও সরকারি আয়ের বড় অংশ জ্বালানি খাতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে দেশটির তেল স্থাপনা, রপ্তানি টার্মিনাল, বন্দর কিংবা পরিবহনব্যবস্থায় বড় ধরনের হামলা হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
সৌদি আরবের জ










