জরুরি তেলের মজুত কমে আসছে, অন্যদিকে বিভিন্ন দেশের সরকারি ঋণ ও বাজেট ঘাটতি ক্রমেই বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন কোনো সংকট দেখা দিলে তা সামাল দিতে বিশ্ব অর্থনীতিকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাম্প্রতিক পূর্বাভাসে এ বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
আইএমএফের বিশ্ব অর্থনৈতিক পূর্বাভাস প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ছয় মাসে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব আশঙ্কার তুলনায় ভালোভাবে সামাল দিয়েছে বিশ্ব অর্থনীতি। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে যেসব জরুরি মজুত ও নীতিগত সুযোগ কাজে লাগানো হয়েছে, সেগুলো এখন অনেকটাই সীমিত হয়ে এসেছে।
সংস্থাটির মতে, হরমুজ প্রণালির বিকল্প পথে তেল সরবরাহ এবং কৌশলগত জ্বালানি মজুত থেকে তেল বাজারে ছাড়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের প্রভাব কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু নতুন করে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়লে কিংবা জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে।
আইএমএফ সতর্ক করেছে, জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ানো এবং ভবিষ্যতের সংকট মোকাবিলায় আর্থিক ও নীতিগত প্রস্তুতি জোরদার করা জরুরি। তা না হলে বিশ্ব অর্থনীতির সংকট সহ্য করার ক্ষমতা দ্রুত সীমিত হয়ে পড়তে পারে। তেলের মজুত কমে যাওয়ায় নতুন কোনো সংঘাতের প্রভাবে সরবরাহ ব্যাহত হলে জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
গত মার্চে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বাড়াতে ইতিহাসের বৃহত্তম জরুরি তেল মজুত ছাড়ার ঘোষণা দেয়। পরে জ্বালানিমন্ত্রীদের এক বৈঠকে এই কার্যক্রম আরও দ্রুত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
এদিকে জরুরি জ্বালানি মজুতের সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত ১৯৮২ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে বলে জানা গেছে। এতে ভবিষ্যতে বড় ধরনের সরবরাহ সংকট দেখা দিলে দেশটির পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জ্বালানির দাম কমানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে সমঝোতার কথাও সামনে এসেছে। এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে রাশিয়ার ডিজেল আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, এতে যুক্তরাষ্ট্রের পাম্পে ডিজেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমার সম্ভাবনা সীমিত।
বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়াল আইএমএফ
জ্বালানি সংকট ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও চলতি বছরের বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সামান্য বাড়িয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির নতুন পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর বৈশ্বিক অর্থনীতি ৩ দশমিক ১ শতাংশ হারে বাড়তে পারে। এর আগে জুলাইয়ে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল ৩ শতাংশ।
তবে ২০২৭ সালের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস অপরিবর্তিত রেখে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চলতি বছর ২ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে বলে জানিয়েছে আইএমএফ। ২০২৭ সালের জন্যও দেশটির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ২ দশমিক ৩ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগের পূর্বাভাসের তুলনায় সামান্য বেশি।
যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রেও চলতি বছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়িয়ে ১ দশমিক ৩ শতাংশ করা হয়েছে। জুলাইয়ের পূর্বাভাসের তুলনায় এটি ০ দশমিক ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি। তবে ২০২৭ সালে দেশটির প্রবৃদ্ধি কমে ১ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে ধারণা করছে সংস্থাটি।
আইএমএফের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা সিলভানা তেনরেইরো বলেন, বিশ্ব অর্থনীতি এখনো বিভিন্ন সংকট সামাল দেওয়ার সক্ষমতা দেখাচ্ছে। তবে এই সক্ষমতা ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছে। তাঁর মতে, নীতিনির্ধারকদের চলমান সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য অর্থনীতির ভিত্তিও শক্তিশালী করতে হবে।
ঋণ ও বাজেট ঘাটতি বাড়ায় বাড়ছে উদ্বেগ
বিশ্বজুড়ে সরকারি ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকায় ব্যয় নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা। তিনি সরকারগুলোকে প্রয়োজনীয় নীতিগত পদক্ষেপ নিতে দেরি না করার আহ্বান জানিয়েছেন।
জর্জিয়েভার মতে, সংকট মোকাবিলার জন্য সরকারগুলোর হাতে প্রয়োজনীয় নীতিগত উপায় ও সরঞ্জাম রয়েছে। এখন সেগুলো বিচক্ষণতার সঙ্গে ব্যবহারের সময়।
আইএমএফের আশঙ্কা, অনেক দেশের ঋণ ও বাজেট ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় ভবিষ্যতে জ্বালানি বা খাদ্যের দাম আবার বাড়লে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমানোর সুযোগ সীমিত হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব থেকে ভোক্তাদের সুরক্ষা দিতে অনেক সরকারের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ নাও থাকতে পারে।
সব মিলিয়ে, বিশ্ব অর্থনীতি আপাতত সংকটের চাপ সামাল দিতে পারলেও জ্বালানি মজুত কমে যাওয়া, সরকারি ঋণ বৃদ্ধি এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। তাই ভবিষ্যতে বড় কোনো সংকট দেখা দিলে তা মোকাবিলায় দেশগুলো কতটা প্রস্তুত, সেই প্রশ্নই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।










