মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপ করা সংবাদমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আদেশ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত। মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সিএনএন, এমএস নাও ও পলিটিকোকে হোয়াইট হাউসে প্রবেশের অনুমতি দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, সংবাদমাধ্যমগুলোর ওপর এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে সুরক্ষিত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা লঙ্ঘন করতে পারে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের জেলা বিচারক টিম কেলি এ আদেশ দেন। তিনি মনে করেন, সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন ও মতামতের কারণে তাদের প্রবেশাধিকার বাতিল করা হয়ে থাকলে তা প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এমন পদক্ষেপ সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিচারক তার আদেশে উল্লেখ করেন, ট্রাম্পের বক্তব্য থেকে ধারণা পাওয়া যায়, সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনকে ভুল ও নিজের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট মনে করার কারণেই তাদের হোয়াইট হাউসে প্রবেশ সীমিত করা হয়েছে। কেবল সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টিভঙ্গি বা প্রতিবেদনের কারণে তাদের প্রবেশাধিকার কেড়ে নেওয়া হলে তা সাংবিধানিক প্রশ্ন তৈরি করে।
জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল বলে বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে যে যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে, সেটিও গ্রহণ করেননি বিচারক। তার পর্যবেক্ষণ, শুরু থেকেই জাতীয় নিরাপত্তার ভিত্তিতে অনুমতিপত্র বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল—এমন প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি। ট্রাম্পও সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তাকে এ সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেননি।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে নিয়োগ পাওয়া বিচারক কেলি মনে করেন, প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের ভিত্তিতে নিষেধাজ্ঞাটিকে নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি বৈষম্যমূলক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে।
এর আগে মামলার প্রাথমিক পর্যায়ে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রবেশাধিকার পুনর্বহালের নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি। তখন তার পর্যবেক্ষণ ছিল, প্রবেশাধিকার বাতিলের আগে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলোকে যথাযথভাবে কারণ জানানো কিংবা নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
মামলা দায়েরের পর হোয়াইট হাউস সংবাদমাধ্যমগুলোর কাছে চিঠি পাঠিয়ে নিষেধাজ্ঞার কারণ ব্যাখ্যা করে এবং জবাব দেওয়ার জন্য সময়সীমা নির্ধারণ করে। তবে বিচারক মনে করেন, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার পর এ ধরনের চিঠি পাঠিয়ে আগের আইনি ত্রুটিগুলো যথাযথভাবে দূর করা সম্ভব হয়নি।
নতুন আদেশের ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ রয়েছে। এর আগে নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করে দেওয়া আদালতের আদেশটির মেয়াদ মঙ্গলবার শেষ হওয়ার কথা ছিল।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার পর থেকে ট্রাম্প বারবার এর পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। তার দাবি, সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলো নেতিবাচক ও একপেশে প্রতিবেদন প্রকাশ করায় তাদের সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউসে প্রবেশ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
অন্যদিকে, আদালতে জমা দেওয়া নথিতে বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞার পক্ষে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। এ ক্ষেত্রে ইরান যুদ্ধ, হোয়াইট হাউসের ইস্ট উইংয়ে বলরুম নির্মাণ এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান পার্টির সম্মেলন নিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রকাশিত প্রতিবেদন উল্লেখ করা হয়।
সংবাদমাধ্যমগুলোর আইনজীবীরা আদালতে যুক্তি দেন, এই নিষেধাজ্ঞা শুধু প্রেসিডেন্টকে নিয়ে সংবাদ সংগ্রহের সুযোগ সীমিত করেনি, বরং অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের মধ্যেও ভীতির পরিবেশ তৈরি করেছে। তাদের মতে, সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সমালোচনামূলক সংবাদ প্রকাশে পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
গত বৃহস্পতিবার মামলার শুনানিতে বিচারক কেলি ট্রাম্প প্রশাসন ও বিচার বিভাগের আইনজীবীদের যুক্তি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ব্যক্তি যখন প্রকাশ্যে একটি পদক্ষেপের কারণ হিসেবে নির্দিষ্ট বিষয় উল্লেখ করেন, তখন সরকার পরে ভিন্ন কারণ তুলে ধরলে তা কতটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
বিচার বিভাগের আইনজীবী মাইকেল ভেলচিক আদালতকে বলেন, সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউস থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি প্রেসিডেন্টের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে। তার দাবি, ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই সিএনএনের সমালোচনা করে আসছেন এবং সংবাদমাধ্যমটিকে ‘ভুয়া খবর’ বলে অভিহিত করেছেন।
অন্যদিকে, সংবাদমাধ্যমগুলোর আইনজীবী টেড বুট্রোস জুনিয়র বলেন, নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্ট নিজেই নিয়েছেন এবং এ বিষয়ে তিনি একাধিকবার প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছেন।
আদালতের এই আদেশ যুক্তরাষ্ট্রে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার নিয়ে চলমান বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এবং সম্ভাব্য আপিলের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে পরবর্তী আইনি পরিস্থিতি।










