ভারতের উত্তরাখণ্ডে আবারও যাত্রীবাহী হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। বদরিনাথ থেকে পাঁচ তীর্থযাত্রীকে নিয়ে জোশিমঠে ফেরার পথে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে গত ১০ বছরে উত্তরাখণ্ডে ১৩টি হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় অন্তত ২৭ জনের প্রাণহানি হয়েছে। বারবার এমন দুর্ঘটনায় পাহাড়ি রাজ্যটির হেলিকপ্টার পরিষেবার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

উত্তরাখণ্ড ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় তীর্থ ও পর্যটনকেন্দ্র। কেদারনাথ, বদরিনাথ, গঙ্গোত্রী ও যমুনোত্রীকে ঘিরে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তীর্থযাত্রীর সমাগম ঘটে। দুর্গম পাহাড়ি পথে যাতায়াতের সময় বাঁচাতে অনেকেই বেসরকারি হেলিকপ্টার পরিষেবা ব্যবহার করেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একের পর এক দুর্ঘটনা এ পরিষেবার নিরাপত্তাব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত উত্তরাখণ্ডে ১৩টি হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২৭ জন। বিশেষ করে গত পাঁচ বছরে দুর্ঘটনার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচল প্রতিমন্ত্রী মুরলিধর মোহল রাজ্যসভায় জানিয়েছিলেন, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশজুড়ে ১২টি বড় হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সাতটি দুর্ঘটনাই ঘটেছে উত্তরাখণ্ডে।

এর আগে ২০২২ সালের অক্টোবরে কেদারনাথে একটি যাত্রীবাহী হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে পাইলটসহ সাতজনের মৃত্যু হয়। ২০২৫ সালে উত্তরকাশিতে মে ও জুন মাসে পরপর দুটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ১৩ জন। মাত্র ৪৫ দিনের ব্যবধানে ওই যাত্রাপথে পাঁচটি হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা ঘটে, যার মধ্যে দুটি ছিল প্রাণঘাতী।

শুধু উত্তরাখণ্ড নয়, ভারতের অন্যান্য রাজ্যেও হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। গত পাঁচ বছরে মহারাষ্ট্রে চারটি দুর্ঘটনায় সাতজন এবং ছত্তিশগড়ে একটি দুর্ঘটনায় দুজনের মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে গত ১০ বছরে দেশটির বিভিন্ন স্থানে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় ৩৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তরাখণ্ডে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ প্রতিকূল আবহাওয়া ও কম দৃশ্যমানতা। পাহাড়ি উপত্যকায় আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তন, বৃষ্টি ও ঘন মেঘের কারণে উড্ডয়ন ও অবতরণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। পাশাপাশি কিছু দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে যান্ত্রিক ত্রুটির বিষয়টিও সামনে এসেছে।

সর্বশেষ দুর্ঘটনাটি ঘটেছে ট্রান্স ভারত অ্যাভিয়েশন প্রাইভেট লিমিটেডের একটি হেলিকপ্টারে। বদরিনাথ থেকে পাঁচ যাত্রী নিয়ে জোশিমঠে ফেরার পথে হাথি পর্বতের পেছনে ছায়ি গ্রামের কাছে হেলিকপ্টারটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে মারওয়ারি সেতুর কাছে জেপি বিদ্যুৎকেন্দ্রের অদূরে পাহাড়ের গায়ে হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।

উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামি দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। নিহত পাঁচ যাত্রীই বেঙ্গালুরুর বাসিন্দা ছিলেন। প্রাথমিকভাবে প্রতিকূল আবহাওয়া, অবিরাম বৃষ্টি ও কম দৃশ্যমানতাকে দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চারধাম যাত্রায় হেলিকপ্টারের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তাব্যবস্থাও আরও জোরদার করা প্রয়োজন। বিশেষ করে উচ্চ পার্বত্য এলাকায় উড্ডয়ন ও অবতরণের জন্য পাইলটদের বিশেষ প্রশিক্ষণ, আবহাওয়ার নির্ভুল পূর্বাভাস এবং নিয়মিত যান্ত্রিক পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এসব বিষয়ে যথাযথ সতর্কতা না নিলে তীর্থযাত্রীদের দ্রুত যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হেলিকপ্টার পরিষেবাই বড় ধরনের প্রাণহানির কারণ হয়ে উঠতে পারে।