ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ঝুঁকি, পেশাগত দায়িত্ব কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের কারণে কারও কারও জন্য প্রয়োজন হয় বিশেষ নিরাপত্তা। এ ক্ষেত্রে আলোচনায় আসে ‘গানম্যান’ বা সশস্ত্র দেহরক্ষীর বিষয়টি। তবে বাংলাদেশে চাইলেই যে কেউ সরকারি গানম্যান পান না। ব্যক্তির নিরাপত্তাঝুঁকি, দায়িত্ব ও প্রযোজ্য সরকারি নীতিমালা বিবেচনা করে এ ধরনের নিরাপত্তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সাধারণত রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি, হুমকির মুখে থাকা বিশিষ্ট নাগরিক কিংবা বিশেষ নিরাপত্তার প্রয়োজন রয়েছে এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে। তবে শুধু পদমর্যাদা বা সামাজিক পরিচয়ের কারণে প্রত্যেকের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে গানম্যান বরাদ্দ হয় বিষয়টি এমন নয়। নিরাপত্তার ধরন ও পরিধি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে।
কারা পেতে পারেন বিশেষ নিরাপত্তা?
বিশেষ নিরাপত্তার প্রয়োজন হতে পারে কয়েক ধরনের ব্যক্তির। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি, নির্দিষ্ট হুমকির মুখে থাকা রাজনীতিবিদ বা বিশিষ্ট নাগরিক এবং গুরুত্বপূর্ণ মামলার ঝুঁকিপূর্ণ সাক্ষীর নিরাপত্তার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করতে পারে।
এ ছাড়া কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট হুমকি থাকলে তিনি পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানাতে পারেন। তবে হুমকির অভিযোগ করলেই গানম্যান পাওয়া নিশ্চিত নয়। অভিযোগের সত্যতা, ঝুঁকির মাত্রা ও প্রয়োজনীয়তা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
গানম্যান ও বডিগার্ডের মধ্যে পার্থক্য কী?
গানম্যান বলতে সাধারণত সশস্ত্র নিরাপত্তাকর্মীকে বোঝানো হয়। অন্যদিকে বডিগার্ড বলতে ব্যক্তির নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত দেহরক্ষীকে বোঝায়, যিনি সশস্ত্র বা নিরস্ত্র দুই ধরনেরই হতে পারেন।
সরকারি নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। অন্যদিকে বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বৈধতা এবং অস্ত্র ব্যবহারের অনুমোদনের বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি।
সরকারি গানম্যান পেতে আবেদন করবেন যেভাবে
কোনো ব্যক্তি নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হলে প্রথমে স্থানীয় থানা, সংশ্লিষ্ট পুলিশ কমিশনার বা জেলা পুলিশের কাছে হুমকির বিষয়টি জানাতে পারেন। প্রয়োজনে লিখিত অভিযোগের সঙ্গে হুমকির বার্তা, কলের তথ্য, জিডি বা মামলার নথিসহ প্রাসঙ্গিক প্রমাণ জমা দেওয়া যেতে পারে।
এরপর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। বিশেষ নিরাপত্তার প্রয়োজন হলে বিষয়টি যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হতে পারে। সরকারি গানম্যান পাওয়ার জন্য সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য একক আবেদনপদ্ধতি বা নিশ্চিত অনুমোদনপ্রক্রিয়া রয়েছে।
বিশেষ নিরাপত্তা প্রদানের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের নির্দেশনা রয়েছে। এ-সংক্রান্ত সরকারি নথি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে পাওয়া যাবে।
বেসরকারিভাবে দেহরক্ষী নিয়োগের নিয়ম
কেউ ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান থেকে দেহরক্ষী নিয়োগ করতে পারেন। তবে প্রতিষ্ঠানটির বৈধতা এবং সশস্ত্র নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অস্ত্র ও ব্যবহারসংক্রান্ত অনুমোদন নিশ্চিত করা জরুরি। বেসরকারি নিরাপত্তা সেবা পরিচালনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বেসরকারি নিরাপত্তা সেবা আইন, ২০০৬ প্রযোজ্য।
বেসরকারি দেহরক্ষী নিয়োগের খরচ নির্ভর করে দায়িত্বের সময়, কর্মীর অভিজ্ঞতা, নিরাপত্তার ধরন ও প্রতিষ্ঠানের চুক্তির ওপর। তাই নির্দিষ্ট মাসিক খরচকে সবার জন্য প্রযোজ্য সরকারি হার হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়।
ব্যক্তিগত অস্ত্রের লাইসেন্স কি গানম্যান পাওয়ার সমান?
না। ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স এবং সরকারি গানম্যান নিয়োগ দুটি আলাদা বিষয়। অস্ত্রের লাইসেন্সের ক্ষেত্রে সরকারের নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করতে হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালেও আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহারসংক্রান্ত নীতিমালা প্রকাশ করেছে।
তাই শুধু অস্ত্রের লাইসেন্স থাকলেই কেউ সরকারি গানম্যান পাওয়ার অধিকারী হন না। একইভাবে ব্যক্তিগত দেহরক্ষী নিয়োগ করলেও অস্ত্র বহন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন মেনে চলতে হবে।
নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকলে কী করবেন?
কেউ বাস্তব নিরাপত্তাঝুঁকির মুখে পড়লে প্রথমে পুলিশকে বিষয়টি জানানো, প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংরক্ষণ এবং হুমকির বিবরণসহ লিখিত অভিযোগ করা গুরুত্বপূর্ণ। পরিস্থিতি গুরুতর হলে জরুরি সহায়তা নেওয়া উচিত।
মনে রাখতে হবে, গানম্যান পাওয়া কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা নয়; এর মূল উদ্দেশ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তাই আবেদনকারীর পরিচয় বা প্রভাবের পরিবর্তে প্রকৃত ঝুঁকি, প্রয়োজনীয়তা এবং প্রযোজ্য বিধিমালার ভিত্তিতেই নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচিত হওয়া উচিত।










