জমির মালিকানা নিয়ে একাধিক পক্ষের মধ্যে দেওয়ানি মামলা বিচারাধীন থাকলে বিরোধপূর্ণ জমি অর্পিত সম্পত্তির তালিকা থেকে অবমুক্ত করা যাবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, উপযুক্ত দেওয়ানি আদালতে জমির মালিকানা চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হওয়ার পর রায়ে বিজয়ী পক্ষের অনুকূলে সম্পত্তিটি অবমুক্ত করা যেতে পারে।
‘সাহাবুদ্দিন আহমেদ বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য’ মামলায় জমির মালিকানা নিয়ে দায়ের করা দুটি রিট আবেদন নিষ্পত্তি করে এ রায় দেন হাইকোর্ট। বিচারপতি ফাতেমা নজীব ও বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ গত ১৯ মে রায় দেন। ২২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। রায়ের মূল অংশ লেখেন বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিম।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ফরিদপুরের ৭ দশমিক ২৩ শতাংশ জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত। জমিটির মূল মালিক ছিলেন যমুনা চামার ও গয়ানাত চামার। পরবর্তী সময়ে জমিটি অনিল কুমার দত্তের মালিকানায় আসে। দানসূত্রে তার ছেলে অলোক কুমার দত্ত জমিটির মালিক হন। পরে ১৯৯৬ সালের ৮ জুলাই নিবন্ধিত বিক্রয় দলিলের মাধ্যমে অলোক কুমার দত্ত জমিটি সাহাবুদ্দিন আহমেদের কাছে বিক্রি করেন এবং দখল বুঝিয়ে দেন।
অন্যদিকে, মামলার অন্যতম বিবাদী মো. জাহিদুর রহমানের দাবি, অলোক কুমার দত্ত ১৯৯৬ সালের ২৩ মে তার সঙ্গে জমিটি বিক্রির জন্য একটি বায়নাপত্র সম্পাদন করেছিলেন। ওই চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে তিনি ২০০১ সালে দেওয়ানি মামলা করেন। পরে একই বছরের ২৮ অক্টোবর একতরফা ডিক্রি পান এবং ২০০৩ সালে আদালতের মাধ্যমে নিবন্ধিত দলিলের অধিকারী হন।
ওই রায় ও ডিক্রির বিরুদ্ধে সাহাবুদ্দিন আহমেদ ২০২১ সালের ২৫ আগস্ট ফরিদপুরের জেলা জজ আদালতে টাইটেল আপিল করেন। বিলম্ব মার্জনার পর আপিলটি শুনানির জন্য গ্রহণ করা হলে জাহিদুর রহমান ওই আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে দেওয়ানি রিভিশন দায়ের করেন।
পরবর্তী শুনানিতে হাইকোর্ট আগের আদেশ বাতিল করে আপিল গ্রহণের বিষয়ে নতুন করে শুনানির নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২৫ মে ফরিদপুরের জেলা জজ আদালত আপিলটি গ্রহণ করেন। এ আদেশের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে জাহিদুর রহমান আবারও হাইকোর্টে দেওয়ানি রিভিশন দায়ের করেন। ওই মামলায় রুল জারির পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়। মামলাটি এখনো হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন।
শুনানিতে সাহাবুদ্দিন আহমেদের আইনজীবী জাকির হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ১৯৯৬ সালের নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে জমির মালিকানা অর্জনের পর থেকে তার মক্কেল জমিটি ভোগদখল করে আসছেন। তিনি যুক্তি দেন, ২০০১ সালের মামলায় সাহাবুদ্দিন আহমেদকে পক্ষভুক্ত করা হয়নি। তাই ওই মামলার ডিক্রি ও পরবর্তী দলিলের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অন্যদিকে, জাহিদুর রহমানের আইনজীবী মো. নাসির শিকদার দাবি করেন, তার মক্কেলের বায়নাপত্র সাহাবুদ্দিন আহমেদের বিক্রয় দলিলের আগেই সম্পাদিত হয়েছিল। আদালতের ডিক্রির ভিত্তিতে অর্জিত স্বত্ব ও দলিলের কারণে তার মক্কেলের দাবি আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য।
হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণে বলেন, অলোক কুমার দত্ত ও জাহিদুর রহমানের মধ্যে সম্পাদিত বায়নাপত্র বাস্তবায়নসংক্রান্ত দেওয়ানি মামলার রায় ও ডিক্রি নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। একই সঙ্গে সাহাবুদ্দিন আহমেদের নামে করা বিক্রয় দলিলের বৈধতা নিয়েও বিরোধ রয়েছে। সংক্ষিপ্ত রিট কার্যক্রমে এসব জটিল প্রশ্নের নিষ্পত্তি করা সম্ভব নয়।
আদালত আরও বলেন, বিরোধপূর্ণ সম্পত্তির মালিকানা ও স্বত্ব আগে উপযুক্ত দেওয়ানি আদালতের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। সেই সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত জমিটি সাহাবুদ্দিন আহমেদ কিংবা জাহিদুর রহমান—কোনো পক্ষের অনুকূলেই অর্পিত সম্পত্তির তালিকা থেকে অবমুক্ত করা উচিত নয়।
রায়ে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, হাইকোর্টে বিচারাধীন দেওয়ানি রিভিশনের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির পর যে পক্ষের অনুকূলে জমির মালিকানা নির্ধারিত হবে, সেই পক্ষের অনুকূলে সম্পত্তিটি অবমুক্ত করতে হবে। এর আগ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে বিরোধপূর্ণ জমির দখলের বিষয়ে স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে বলা হয়েছে।
এসব পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা দিয়ে হাইকোর্ট রিট আবেদন দুটির নিষ্পত্তি করেন।









