সারা দেশে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ সাংগঠনিক কাঠামো থাকা একটি রাজনৈতিক দলের কার্যালয় পরিচালনা ও বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে বছরে ৩০২ থেকে ৩৯৩ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। আর ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত সাংগঠনিক কার্যক্রম বিস্তৃত হলে সম্ভাব্য বার্ষিক ব্যয় দাঁড়াতে পারে ১ হাজার ৫৩২ থেকে ২ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা।

অথচ সদস্যদের চাঁদা থেকে এই ব্যয়ের সামান্য অংশই সংগ্রহ করা সম্ভব। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রকাশিত আয়-ব্যয়ের হিসাবের সঙ্গেও সম্ভাব্য ব্যয়ের বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) পরিচালিত এক গবেষণায় রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়নের এমন চিত্র উঠে এসেছে।

রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এতে রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়ন, অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, নেতৃত্ব নির্বাচন, প্রার্থী মনোনয়ন এবং অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিরোধের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক অর্থায়নে ব্যক্তিনির্ভরতা এবং অনানুষ্ঠানিক উৎসের প্রাধান্য দলগুলোকে ব্যবসায়ী ও বিত্তশালীদের ওপর নির্ভরশীল করে তুলছে। এর ফলে দলগুলোর মধ্যে ব্যক্তি ও পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতির বিকাশ ঘটছে। একই সঙ্গে দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, গণতান্ত্রিক চর্চা ও অন্তর্ভুক্তির ঘাটতি রয়েছে।

সাংগঠনিক ব্যয় হাজার কোটি ছাড়ায়

গবেষণায় রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সাংগঠনিক কাঠামো পরিচালনার সম্ভাব্য ব্যয়ের হিসাব করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধনের শর্ত পূরণ করে ন্যূনতম ২২টি জেলা ও ১০১টি উপজেলায় কার্যালয় ও কার্যক্রম পরিচালনা করতেই একটি দলের বছরে প্রায় ১৪ থেকে ২০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।

অন্যদিকে, সব জেলা, মহানগর, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কার্যক্রম বিস্তৃত থাকলে সম্ভাব্য বার্ষিক ব্যয় দাঁড়াবে ৩০২ থেকে ৩৯৩ কোটি টাকা। আর ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত সাংগঠনিক শাখা বিস্তৃত হলে এই ব্যয় বেড়ে ১ হাজার ৫৩২ থেকে ২ হাজার ১৮৮ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।

এত বিপুল ব্যয়ের বিপরীতে সদস্যদের চাঁদা থেকে সম্ভাব্য আয় অনেক কম। গবেষণায় বলা হয়েছে, ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত সাংগঠনিক কাঠামোর ক্ষেত্রে সদস্যদের চাঁদা থেকে সম্ভাব্য আয় ১১৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ শুধু সদস্যদের চাঁদার ওপর নির্ভর করে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব নয়। এ অবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থের অন্যান্য উৎস ও ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ব্যবসায়ী ও বিত্তশালীদের পৃষ্ঠপোষকতা

টিআইবির গবেষণায় বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন ও কার্যক্রম পরিচালনার বিদ্যমান ব্যবস্থা প্রতিযোগিতামূলক পৃষ্ঠপোষকতার পরিবেশ তৈরি করছে। ফলে দলগুলোকে নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যবসায়ী ও বিত্তশালীদের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

রাজনৈতিক অর্থায়নে ব্যক্তিনির্ভরতা এবং অনানুষ্ঠানিক উৎসের প্রাধান্যকে দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সুশাসনের জন্য বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি। এর ফলে প্রভাবশালী দলগুলোতে ক্ষমতার অপব্যবহার, কালো টাকার প্রভাব, দুর্বৃত্তায়ন ও অন্তর্দ্বন্দ্ব বিকশিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন থেকে শুরু করে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা ও নির্বাচনে অংশগ্রহণ অতিমাত্রায় অর্থনির্ভর হওয়ায় দলগুলো ব্যবসায়ী ও বিত্তশালীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

তার মতে, রাজনৈতিক অর্থায়নের এই ব্যক্তিনির্ভরতা ও অনানুষ্ঠানিকতার কারণে প্রভাবশালী দলগুলোতে ক্ষমতার অপব্যবহার, কালো টাকার প্রভাব, দুর্বৃত্তায়ন ও অন্তর্দ্বন্দ্ব বাড়ছে। এতে রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতাকেন্দ্রিক ব্যবসায়িক মডেলে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে।

আর্থিক নীতিমালা নেই, প্রকাশ হয় না হিসাব

গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের আর্থিক নীতিমালা ও কার্যপ্রণালি বিধি নেই। দলগুলোর গঠনতন্ত্রে সদস্যদের পদভেদে চাঁদার হার, অনুদান গ্রহণের শর্ত, মনোনয়ন ফরমের ফি, হিসাব সংরক্ষণ, আর্থিক লেনদেন, ক্রয়, নিরীক্ষা ও আর্থিক জবাবদিহির বিষয়ে নির্দেশনা অস্পষ্ট।

এ ছাড়া দলগুলো নিয়মিত বার্ষিক বাজেট প্রণয়ন করে না। তাদের প্রকৃত বার্ষিক আয়-ব্যয়ের নিরীক্ষিত প্রতিবেদনও দল বা নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে প্রকাশ করা হয় না। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থের প্রকৃত উৎস, সংগ্রহের পদ্ধতি এবং ব্যয়ের খাত সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জানার সুযোগ সীমিত।

কণ্ঠভোটে নেতা নির্বাচন

রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চার ক্ষেত্রেও ঘাটতি রয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। অধিকাংশ দল জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে দলীয় প্রধান নির্বাচন করলেও গোপন ব্যালটের পরিবর্তে কণ্ঠভোটে নির্বাচন করে। দলীয় প্রধান পদে একাধিক ব্যক্তির মনোনয়ন গ্রহণের চর্চাও নেই বললেই চলে। মাত্র দুটি দলে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী পাওয়ার তথ্য পেয়েছে গবেষক দল।

গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ১০টি রাজনৈতিক দলে পরিবারকেন্দ্রিক নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত রয়েছে। ১২টি দলের প্রধান ১০ বছর বা তার বেশি সময় ধরে একই পদে দায়িত্ব পালন করছেন। অধিকাংশ দলের গঠনতন্ত্রে একজন ব্যক্তি কতবার বা কত মেয়াদে দলীয় প্রধান থাকতে পারবেন, তা নির্দিষ্ট করা নেই।

দলগুলোর আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ব্যক্তিনির্ভর। এ ছাড়া তিনটি দলের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ এবং একটি দলের কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া গঠনতন্ত্রে উল্লেখ নেই। ১৬টি দলের জাতীয় কাউন্সিল অনিয়মিত। এসব কাউন্সিলে সাধারণত আগে থেকে নির্ধারিত সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়।

মনোনয়নেও অর্থ-প্রতিপত্তির প্রভাব

নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতার ঘাটতি পেয়েছে টিআইবি। অধিকাংশ দলের গঠনতন্ত্রে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা ও অযোগ্যতার শর্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। ছয়টি দলের গঠনতন্ত্রে জনপ্রিয়তা, সততা ও দলের প্রতি আনুগত্যের মতো বিষয় উল্লেখ থাকলেও সেগুলোর সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নেই।

গবেষণায় প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনি প্রার্থী মনোনয়নে অর্থ-প্রতিপত্তি ও ব্যবসায়ীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। তিনটি প্রভাবশালী দলে প্রার্থী বাছাইয়ে মনোনয়ন-বাণিজ্যের অভিযোগও পাওয়া গেছে। এ ছাড়া বিগত পাঁচটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যবসায়ী প্রার্থী ও ব্যবসায়ী সংসদ সদস্যের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি লক্ষ্য করেছে গবেষক দল।

সুশাসন নিশ্চিত করতে ১২ দফা সুপারিশ

রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে সুশাসন নিশ্চিত করতে গবেষণা প্রতিবেদনে ১২ দফা সুপারিশ করেছে টিআইবি। এর মধ্যে রয়েছে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), ১৯৭২ এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা, ২০০৮-এর প্রয়োজনীয় সংশোধন; রাজনৈতিক দলগুলোকে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় আনা এবং নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে দলগুলোর আর্থিক হিসাব যাচাই ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের তদারকি বাড়ানো।

এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনের তালিকাভুক্ত চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্মের মাধ্যমে দলগুলোর আর্থিক লেনদেন নিরীক্ষা, নিয়মিত কাউন্সিল আয়োজন, প্রতিটি পর্যায়ের নেতৃত্ব গোপন ভোটে নির্বাচন এবং দলীয় প্রধানসহ নেতৃত্বস্থানীয় পদে একই ব্যক্তির দায়িত্ব পালনের মেয়াদ নির্দিষ্ট করার সুপারিশ করা হয়েছে। দলীয় নেতৃত্ব ও নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে নারী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে সুশাসন নিশ্চিত করতে অভ্যন্তরীণ সংস্কার অপরিহার্য। এ সংস্কারের দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোকেই নিতে হবে। গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ ও জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য দলগুলোকে নিজেদের মৌলিক সংস্কারের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

গবেষণার আওতায় ৪২টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। এর মধ্যে ৩৭টি নিবন্ধিত ও পাঁচটি অনিবন্ধিত দল। ৩২টি দল গবেষকদের তথ্য দিয়েছে। গবেষণায় ২০০৮ সালে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন কার্যক্রম শুরুর পর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্যও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।