রাজধানীর ফুটপাত দখল একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। পথচারীদের স্বাভাবিক চলাচলের জন্য তৈরি ফুটপাত যখন বছরের পর বছর হকার, দোকান ও বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনার দখলে থাকে, তখন সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ। ব্যস্ত সড়কে যানবাহনের পাশাপাশি ফুটপাতও যদি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে, তাহলে নিরাপদ ও স্বাভাবিক নগরজীবন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে যায়।

এই বাস্তবতায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) উদ্যোগে মিরপুর-১০ থেকে হোপ মার্কেট পর্যন্ত দীর্ঘদিনের দখলকবলিত ফুটপাত দখলমুক্ত করার কার্যক্রম নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। বিশেষ করে দীর্ঘদিন পর সাধারণ মানুষ ফুটপাত দিয়ে স্বাভাবিকভাবে হাঁটার সুযোগ পাওয়ায় যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, তা প্রমাণ করে এই উদ্যোগের প্রয়োজন ছিল এবং নগরবাসী এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানায়।

ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন জানিয়েছেন, ফুটপাত দখলমুক্ত করার পর অনেক সাধারণ মানুষ তাদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন। কেউ কেউ বলেছেন, ১৩ থেকে ২০ বছর ধরে তারা ওইভাবে ঢাকার রাস্তায় হাঁটতে পারেননি। এই বক্তব্যগুলো আমাদের নগর ব্যবস্থাপনার বাস্তব চিত্রটিই সামনে আনে। একজন নাগরিক নিজের শহরের ফুটপাত ব্যবহার করতে পারবেন না এর চেয়ে দুঃখজনক বিষয় আর কী হতে পারে?

citytouch 728-X-90

এ কারণে ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনকে দুরবীন নিউজের পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও সাধুবাদ জানাই। কারণ দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা নিয়ে দৃশ্যমানভাবে উদ্যোগ নেওয়া এবং সেটিকে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া সহজ বিষয় নয়। জনগণের চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করতে প্রশাসনের এমন উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক।

তবে এখানেই কাজ শেষ নয়। বরং এখন থেকেই শুরু হতে পারে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

কারণ আমাদের দেশে ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান নতুন কোনো বিষয় নয়। বহুবার অভিযান হয়েছে, ফুটপাত খালি হয়েছে, অবৈধ স্থাপনা সরানো হয়েছে। কিন্তু কিছুদিন পর আবার সেই একই জায়গায় দোকান বসেছে, হকার ফিরেছেন, পথচারীর জায়গা আবার সংকুচিত হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে ফুটপাত কি সত্যিই দখলমুক্ত হবে, নাকি কিছুদিন পর আবার আগের চিত্র ফিরে আসবে?

আমাদের মনে রাখতে হবে, ফুটপাত একবার খালি করাই সাফল্য নয়; বরং সেটিকে দীর্ঘদিন খালি ও ব্যবহারযোগ্য রাখাই প্রকৃত সাফল্য।

মিরপুর-১০-এর অভিযানকে ঘিরে হকারদের সঙ্গে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। এমন পরিস্থিতিতে ডিএনসিসি প্রশাসক কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন, “আমার লাশের ওপর দিয়ে তারা ফুটপাতে বসবে।” বক্তব্যটি ইতোমধ্যে মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সাধারণ মানুষ এখন এই কঠোর অবস্থানের বাস্তবায়ন দেখতে চায়।

আমরা মনে করি, একজন প্রশাসকের কঠোর বক্তব্য তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার প্রতিফলন প্রশাসনিক কার্যক্রমে দেখা যায়। তাই শুধু একটি এলাকায় অভিযান চালিয়ে থেমে গেলে চলবে না। যেসব এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাত দখল হয়ে আছে, সেসব এলাকাতেও পর্যায়ক্রমে অভিযান চালাতে হবে এবং একই সঙ্গে পুনর্দখল ঠেকাতে নিয়মিত নজরদারি চালাতে হবে।


শুধু হকার উচ্ছেদ করলেই কি সমস্যার সমাধান?

এই প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ।

একজন হকার ফুটপাতে বসেছেন এটি দৃশ্যমান বাস্তবতা। কিন্তু একজন হকার কীভাবে বছরের পর বছর একই জায়গায় বসে থাকেন, কে তাকে জায়গা করে দেয়, কারা এর সুযোগ নেয়, কোথাও নিয়মিত টাকা আদায় হয় কি না এসব প্রশ্নের উত্তরও খুঁজে দেখা প্রয়োজন।

কারণ কোনো একটি ফুটপাত যদি বছরের পর বছর দখলে থাকে, তাহলে সেটি শুধু একজন হকারের সমস্যা নয়; এর পেছনে একটি ব্যবস্থাপনা, দুর্বল নজরদারি কিংবা স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো চক্র কাজ করছে কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়।

একজন হকারকে সরিয়ে দিয়ে যদি কয়েকদিন পর আবার অন্য কেউ একই জায়গায় বসে পড়েন, তাহলে বুঝতে হবে সমস্যার মূল জায়গায় আমরা পৌঁছাতে পারিনি।

তাই ফুটপাত দখলমুক্ত করার পাশাপাশি দখলের নেপথ্যের ব্যবস্থাকেও ভাঙতে হবে। চাঁদাবাজি, অবৈধভাবে জায়গা নিয়ন্ত্রণ, প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়া কিংবা কোনো ধরনের অনিয়ম থাকলে সেগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।


হকারদের জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে

ফুটপাত জনগণের চলাচলের জায়গা এ নিয়ে কোনো আপস করা উচিত নয়। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে অনেক মানুষের জীবিকা হকারি ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল।

তাই মানবিক নগর ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে তাদের জন্য বিকল্প ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা করা যেতে পারে। নির্দিষ্ট স্থানে ব্যবসার সুযোগ, পুনর্বাসন বা অন্য কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ভাবতে হবে।

তবে বিকল্প ব্যবস্থা করার অর্থ কখনোই এই নয় যে পথচারীদের অধিকার কেড়ে নেওয়া হবে।

একজন মানুষের জীবিকার অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি লাখো মানুষের নিরাপদে হাঁটার অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ। নগর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব হলো দুই পক্ষের প্রয়োজনের মধ্যে একটি কার্যকর ও টেকসই সমাধান তৈরি করা।


ফুটপাত দখলমুক্ত অভিযান যেন লোকদেখানো না হয়

মিরপুর-১০ থেকে হোপ মার্কেট পর্যন্ত যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটি যদি কেবল কয়েক দিনের কর্মসূচি হয়ে থাকে, তাহলে এর সুফল দীর্ঘস্থায়ী হবে না। কিন্তু যদি এটিকে ধারাবাহিক নগর ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে নেওয়া হয়, তাহলে এটি একটি দৃষ্টান্ত হতে পারে।

একদিন অভিযান চালিয়ে সংবাদ শিরোনাম হওয়া সহজ। কিন্তু একটি ফুটপাত বছরের পর বছর দখলমুক্ত রাখা অনেক কঠিন। আর প্রকৃত সফলতা সেখানেই।

আমরা চাই না, আজ ফুটপাত খালি হলো, আগামী মাসে আবার দখল হলো, এরপর আবার অভিযান চালাতে হলো। এমন হলে প্রশাসনের সময়, অর্থ ও জনবল সবই বারবার ব্যয় হবে, কিন্তু সাধারণ মানুষের সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।

তাই প্রতিটি উচ্ছেদ অভিযানের পর সংশ্লিষ্ট এলাকায় নিয়মিত নজরদারি থাকা প্রয়োজন। পুনরায় দখলের চেষ্টা হলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে জনগণকেও সচেতন করতে হবে, যাতে কেউ অবৈধভাবে ফুটপাত দখল করলে স্থানীয়ভাবে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর সুযোগ থাকে।


প্রশাসকের বক্তব্যের বাস্তবায়নই এখন প্রত্যাশা

ডিএনসিসি প্রশাসক বলেছেন, যেসব এলাকায় ফুটপাত দখল করে রাখা হয়েছে, পর্যায়ক্রমে সেসব জায়গাতেও অভিযান চালানো হবে। তিনি আরও জানিয়েছেন, এই কার্যক্রম চলমান থাকবে এবং কেউ পুনরায় ফুটপাত দখলের চেষ্টা করলে উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত থাকবে।


এই ধারাবাহিকতাই আমরা দেখতে চাই।

মিরপুর-১০ দিয়ে যদি একটি কার্যকর ও স্থায়ী উদ্যোগের সূচনা হয়ে থাকে, তাহলে সেটি রাজধানীর অন্যান্য দখলকবলিত এলাকাতেও ছড়িয়ে দিতে হবে। ফুটপাত কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা ব্যবসায়ীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি নগরবাসীর সম্পদ এবং পথচারীদের চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করার জন্যই নির্মিত।


শেষ কথা

মিরপুর-১০-এর ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ বা কোনো ধরনের সহিংসতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যারা আইন ভেঙেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে এমন পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো, তার কারণও খুঁজে দেখা প্রয়োজন।

তবে এসব ঘটনার মধ্যেও একটি বিষয় পরিষ্কার সাধারণ মানুষ ফুটপাত দখলমুক্ত চায়।

দীর্ঘ ১৩ থেকে ২০ বছর পর কেউ যদি নিজের শহরের ফুটপাত দিয়ে হাঁটার সুযোগ পেয়ে স্বস্তি প্রকাশ করেন, তাহলে সেটিই প্রমাণ করে এই উদ্যোগের প্রয়োজন কতটা ছিল।

তাই ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনের উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই। একই সঙ্গে প্রত্যাশা করি, এই উদ্যোগ যেন মাঝপথে থেমে না যায়। ফুটপাত খালি করার অভিযান নয়, ফুটপাত স্থায়ীভাবে পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত রাখার ব্যবস্থা চাই।

আমরা সাধারণ মানুষ প্রশাসকের সেই কঠোর বক্তব্যের বাস্তবায়ন দেখতে চাই। চাই, কোনো হকার বা দখলদার যেন আর জনগণের হাঁটার রাস্তা দখল করে বসতে না পারেন। একই সঙ্গে চাই, দখলদারত্বের পেছনে যদি কোনো চাঁদাবাজি, প্রভাব বা অনিয়ম থাকে, সেটিও যেন কঠোরভাবে বন্ধ করা হয়।

কারণ ফুটপাত থাকবে পথচারীর জন্য দখলদারির জন্য নয়।

এখন সময় এসেছে প্রমাণ করার এটি কোনো লোকদেখানো অভিযান নয়; এটি একটি স্থায়ী পরিবর্তনের শুরু।


মামুনুর রশিদ খাঁন: সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত), দুরবীন নিউজ ।